রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়া জীবিত এক শিশুকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার বিরুদ্ধে। শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণ ও জমি পাওয়ার লোভে সাজানো হয় হত্যা মামলা, যেখানে জীবিত শিশুকে মৃত দেখানো হয়। মামলায় ১১৮ জনকে আসামি করা হয়।
ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। মোহাম্মদপুরের বছিলা ব্রিজের নিচে গুলিবিদ্ধ হয় ১১ বছরের শিশু সোহাগ। প্রথমে তাকে ভর্তি করা হয় গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আশ্চর্যজনকভাবে, আহত শিশু সোহাগকেই পরে একটি সাজানো মামলায় দেখানো হয় ‘নিহত’।
মামলাটি দায়ের হয় ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। এর চার মাস ছয় দিন পর জানা যায়, সোহাগ জীবিত এবং সুস্থভাবে বেঁচে আছে। পরে আদালতে হাজির হয়ে সোহাগ ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। তার বাবা জহিরুল ইসলাম রাজু-ও আদালতে জানান, এই হত্যা মামলা সম্পূর্ণ সাজানো এবং মিথ্যা।
রাজু অভিযোগ করেন, কেরানীগঞ্জের এনসিপি নেতা মো. শাহজাহান সম্রাট তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, ‘আহত’ হিসেবে মামলা করলে সরকার ৩০ লাখ টাকা ও চার কাঠা জমি দেবে। এই লোভ দেখিয়েই তিনি জীবিত ছেলেকে ‘নিহত’ বানানোর ফাঁদে ফেলেন।
রাজু বলেন, ‘আমারে সম্রাট বলে আহত মামলা করবে, করছে নিহত মামলা। সেদিন ছেলে সাথেই ছিল। তাকে গাড়িতে রেখে আমাকে ওপরে নিয়ে যায়। উকিল সব বলে। আমি শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম।’
ঘটনার পর পুরো পরিবার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে যায়। পরে সাহস সঞ্চয় করে আদালতে গিয়ে প্রকৃত তথ্য দেয়।
একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে হাতে আসা একটি ফোনালাপে শোনা যায়, সম্রাট রাজুকে বলেন, ‘মামলার কপি চইলা গেছে জাতিসংঘে। যদি বাঁচতে চান দ্রুত মন্ত্রণালয়ে কাগজ জমা দেন।” পরে আরও হুমকি দিয়ে বলেন, ’আর যদি মনে করেন আত্মহত্যা করমু, সেটা আপনার বিষয়।’
জানা যায়, রাজুর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে হলেও নদীতে ভেসে যাওয়ায় এখন পরিবারটি গাজীপুরের একটি দুর্গম গ্রামে বাস করছে। সেখানেই দেখা যায় সোহাগকে, যিনি এখনো পায়ে গুলির ক্ষত নিয়ে ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটছেন।
সোহাগ বলেন, “শেখ হাসিনা যেদিন পালাইছে, বাইপাল থানার দিকে একলা পইড়া গেছিলাম। পায়ে গুলি লাগে।” তার মা জানান, ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাতে ঋণ করে কিস্তিতে টাকা তুলতে হয়েছে। বলেন, “না নিলে পা কেটেই ফেলতে হতো।”
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ থানার ওসি মনিরুল হক ডাবলু বলেন, ‘মামলার পর পুলিশ বাদীকে খুঁজে পায়। বাদী ও আসামি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে, সোহাগ জীবিত। মামলাটি এখনো খারিজ হয়নি, মনিটরিং সেলে রয়েছে।’
অভিযুক্ত এনসিপি নেতা শাহজাহান সম্রাট-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এই ঘটনায় ফের প্রশ্ন উঠছে—রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিরীহ পরিবারকে ব্যবহার করে বাণিজ্যের অপচেষ্টা কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে? এক জীবিত শিশুকে ‘শহীদ’ বানিয়ে সেই মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে সাজানো মামলা, রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণের অপব্যবহার এবং অব্যাহত হুমকির মুখে এক পরিবারের জীবনের প্রতিটি দিন এখন আতঙ্কে কাটছে।
খবরওয়ালা/এমএজেড



