চার বছরে আট বিদেশ সফর, প্রশ্নে আইসিটি অধিদপ্তরের প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের (আইসিটি অধিদপ্তর) একজন নন-ক্যাডার গ্রেড-৯ কর্মকর্তার চার বছরের বেশি সময়ের চাকরিজীবনে আটটি বিদেশ সফর এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সহকারী নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার জোনায়েদ সিদ্দিক অর্গানোগ্রামে ওই শাখায় তার পদের সংস্থান না থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে সহকারী নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত। এরই মধ্যে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, দুবাই, ইস্তাম্বুল ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে মোট আটবার সফরের সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

একই সময়ে প্রশাসন শাখায় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) হিসেবে কাজ করা, কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন-সংক্রান্ত কার্যক্রম, বৈদেশিক ভ্রমণ এবং বিভিন্ন ইভেন্টের টেন্ডার ও ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগের সবগুলো এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। অভিযোগপত্রে উত্থাপিত দাবিগুলোর পাশাপাশি সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট ফাইল ও আদেশ যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। বিশেষ করে অডিট আপত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত দায় আছে কি না, সেটিও আলাদাভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

রোবট অলিম্পিয়াডের ব্যয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার অডিট আপত্তি

জোনায়েদ সিদ্দিককে ঘিরে ওঠা অভিযোগের একটি অংশ সরকারি অডিট নথির সঙ্গে সম্পর্কিত। পিটিএসটি অডিট অধিদপ্তরের ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের অডিট মেমো নম্বর-১৩-এ আইসিটি অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একটি ইভেন্টের ব্যয় নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, ২৬তম আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের জন্য ভৌত সেবা সরবরাহে Conference & Exhibition Management Services Limited (CEMS)-এর সঙ্গে ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ৫৪ লাখ ৮১ হাজার ৫৫০ টাকার চুক্তি করা হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি বিল দাখিল করলে ২২ জুন ২০২৫ তারিখের ভাউচারের মাধ্যমে মোট ৫০ লাখ ১৪ হাজার ৫৫০ টাকা পরিশোধ করা হয়।

অডিটে ওই ব্যয়ের মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ‘Miscellaneous and Incidental Cost’ খাতে অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অডিট আপত্তির বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তির শর্ত অনুসারে এই খাতে অর্থ ব্যয়ের আগে কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের পক্ষে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বা সেবা প্রদানের প্রমাণক পাওয়া যায়নি।

ফলে অডিটের প্রশ্নটি কেবল ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার অঙ্ক নিয়ে নয়; বরং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদন, চুক্তির শর্ত এবং ব্যয়ের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণক যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না, সেটিই মূল বিষয়।

এ অডিট আপত্তিতে জোনায়েদ সিদ্দিকের নাম সরাসরি উল্লেখ আছে কি না এবং তার ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করা হয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট মূল নথি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

চার বছরে আট বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগপত্রের অন্যতম প্রধান বিষয় জোনায়েদ সিদ্দিকের বিদেশ সফর। অভিযোগকারীর দাবি, চাকরিতে যোগদানের পর চার বছরের কিছু বেশি সময়ে তিনি আটটি বিদেশ সফর করেছেন। এসব সফরের গন্তব্যের মধ্যে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, দুবাই, ইস্তাম্বুল ও সিঙ্গাপুরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অধিদপ্তরে তার চেয়ে উচ্চতর গ্রেডে কর্মরত অন্তত ৭০ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের অনেকেই কোনো বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বা সফরের সুযোগ পাননি। এর বিপরীতে তুলনামূলকভাবে জুনিয়র একজন কর্মকর্তার বারবার বিদেশ সফরের সুযোগ পাওয়ায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে বিদেশ সফরের সংখ্যা বেশি হওয়াই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। সরকারি সফরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব, সফরের উদ্দেশ্য, মনোনয়ন প্রক্রিয়া, সরকারি অনুমোদন এবং ব্যয়ের উৎস গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রতিটি সফরের সরকারি আদেশ বা জিও, সফরের উদ্দেশ্য, মনোনয়নের ভিত্তি এবং ভ্রমণ ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করলেই বিষয়টির প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব।

প্রশাসন শাখায় দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জোনায়েদ সিদ্দিকের মূল পদ সহকারী নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার হলেও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসন শাখায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগকারীর দাবি, অর্গানোগ্রামে প্রশাসন শাখায় সহকারী নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার পদের সংস্থান নেই।

এর পাশাপাশি তাকে মহাপরিচালকের পিএসের দায়িত্ব পালনের অভিযোগও করা হয়েছে। এ ধরনের দায়িত্বে থেকে বদলি, পদায়ন, ডিডিও দায়িত্ব প্রদান, গাড়ি সুবিধাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে তার প্রভাব তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।

চার বছরে আট বিদেশ সফর প্রশ্নে আইসিটি অধিদপ্তরের প্রশাসন চার বছরে আট বিদেশ সফর, প্রশ্নে আইসিটি অধিদপ্তরের প্রশাসন

 

বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে আইসিটি অফিসারের পদ শূন্য থাকলে সিনিয়র কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত বা চলতি দায়িত্ব দেওয়ার নিয়ম থাকার পরও অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে তিনি ফাইল নোট উপস্থাপন করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। এমন দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে।

তবে এসব দাবি যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ফাইল নোট, অনুমোদন, দায়িত্ব প্রদানের অফিস আদেশ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নথি ছাড়া অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

কোটি টাকার ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা ঘিরে অভিযোগ

জোনায়েদ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ওঠা আরেকটি বড় অভিযোগ ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার সুযোগ ব্যবহার করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, কাজের তুলনায় বেশি বিল তৈরি এবং কাজ না করেও বিল পরিশোধের মতো অনিয়ম করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে অডিট অধিদপ্তর একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি কোষাগারে অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

তবে এই অংশে অভিযোগ ও প্রমাণের পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে উল্লেখিত অডিট নথিতে ২৬তম আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডের একটি ব্যয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার আর্থিক আপত্তির তথ্য রয়েছে। অন্য অডিট আপত্তিগুলোর সঙ্গে জোনায়েদ সিদ্দিকের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি নথি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা দরকার।

বদলি ও ডিডিও দায়িত্ব নিয়েও অভিযোগ

প্রশাসন শাখা এবং মহাপরিচালকের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অর্থের বিনিময়ে কর্মকর্তাদের পোস্টিং, অনিয়মিতভাবে ডিডিও দায়িত্ব প্রদান এবং গাড়ি সুবিধা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ ধরনের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলেও প্রশাসন শাখায় তার প্রভাবের কারণে সেগুলোর কোনো কোনোটি নিষ্পত্তি বা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।

এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অভিযোগগুলোর মূল কপি, ডায়েরি নম্বর, তদন্তের উদ্যোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। অভিযোগ জমা পড়েছিল কি না—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জমা পড়লে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল।

নথি যাচাই ও তদন্তেই মিলতে পারে উত্তর

একজন গ্রেড-৯ নন-ক্যাডার কর্মকর্তা চার বছরের বেশি সময় ধরে প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান করছেন কি না, অর্গানোগ্রামের বাইরে প্রশাসন শাখায় দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, মহাপরিচালকের পিএস হিসেবে কী ধরনের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং একই সময়ে একাধিক বিদেশ সফরের সুযোগ কীভাবে পেয়েছেন—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইভেন্ট ব্যবস্থাপনায় আর্থিক অনিয়ম, বদলি ও পদায়ন, ডিডিও দায়িত্ব প্রদান এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ।

সব অভিযোগকে একইভাবে সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আবার একাধিক অভিযোগ ওঠার কারণে বিষয়গুলো উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। বিশেষ করে সরকারি অডিটে আর্থিক ব্যয় নিয়ে আপত্তি থাকার বিষয়টি নথিভিত্তিকভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।

বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত হলে কয়েকটি নথি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে—চার বছরে করা আটটি বিদেশ সফরের পূর্ণ তালিকা, প্রতিটি সফরের সরকারি জিও ও মনোনয়নপত্র, ব্যয়ের উৎস ও ভ্রমণ বিল, প্রশাসন শাখায় দায়িত্ব পালনের অনুমোদন, মহাপরিচালকের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনের আদেশ, বদলি ও ডিডিও-সংক্রান্ত ফাইল, ইভেন্টের টেন্ডার নথি এবং সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার।

এসব নথি পাশাপাশি রেখে পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর কোনটি বাস্তব, কোনটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অংশ এবং কোনটির সঙ্গে ব্যক্তিগত দায়ের সম্পর্ক রয়েছে—তা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে। শেষ পর্যন্ত অভিযোগের বিচার হওয়া উচিত নথি, প্রক্রিয়া ও প্রমাণের ভিত্তিতেই।

চার বছরে আট বিদেশ সফর প্রশ্নে আইসিটি অধিদপ্তরের প্রশাসন 2 চার বছরে আট বিদেশ সফর, প্রশ্নে আইসিটি অধিদপ্তরের প্রশাসন

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।