গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর গ্রামে অসুস্থ গরু জবাইয়ের পর একই এলাকার কমপক্ষে ১১ জনের দেহে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। তাদের মধ্যে সাত জন গাইবান্ধা শহরের একটি বেসরকারি চিকিৎসালয় থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বাকিরা স্থানীয়ভাবেই চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।
শুক্রবার (৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা গাইবান্ধা রাবেয়া ক্লিনিক অ্যান্ড নার্সিং হোম এবং রাবেয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নেন। গুরুতর আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন— মোজা মিয়া, মোজাফফর মিয়া, শফিকুল ইসলাম ও মাহবুর রহমান।
এই পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর আগে পীরগাছায় গবাদি পশুর মধ্যে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছিল। তবে সম্প্রতি সুন্দরগঞ্জেও গবাদি পশুর মধ্যে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঘাঘট ও তিস্তা নদী দ্বারা বেষ্টিত বামনডাঙ্গা, সর্বানন্দ, তারাপুর, বেলকা ও পৌরসভা এলাকায় এই রোগ চিহ্নিত হয়েছে। ইতোমধ্যে এই অঞ্চলগুলোতে টিকা প্রদান কার্যক্রম চলছে।
এদিকে গাইবান্ধা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়া সাত জন রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছেন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. মঞ্জুরুল করিম প্রিন্স। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, সাত জন রোগীর শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ পাওয়া গেছে। তাদের হাত, মুখ, চোখ এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোসকা ও পচন ধরেছে। তারা জ্বর, ব্যথা, ঘা ও চুলকানিতে ভুগছেন। প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করে আক্রান্তদের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘মূলত অ্যানথ্রাক্স-আক্রান্ত বা রোগাক্রান্ত পশু থেকেই এই সংক্রমণ ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা একটি অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস কাটার কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। সেই সময় তাদের দেহে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। তবে এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। আক্রান্তরা এর আগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। বিষয়টি জেলা সিভিল সার্জনকেও অবহিত করা হয়েছে। নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করলে রোগীরা সুস্থ হয়ে উঠবেন, তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’
কিশামত সদর গ্রামের বাসিন্দা ও বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) মো. হাফিজার রহমান জানান, গত শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) গ্রামের মাহবুর রহমানের একটি অসুস্থ গরু জবাই করে গ্রামের প্রায় ১২০ জনের মধ্যে মাংস ভাগ করে দেওয়া হয়। জবাই ও মাংস কাটার কাজে ১০-১৫ জন সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। চার দিন পর থেকেই তাদের শরীরে ফোসকা ও ঘা দেখা দিতে শুরু করে। এদের মধ্যে কয়েকজন স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেন। কিন্তু অবস্থার অবনতি ঘটলে তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও শহরের ক্লিনিকে যান।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাক জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে ৪-৫ জন অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গাইবান্ধা ও রংপুর মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাত, পা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে তাদের উপসর্গ দেখা গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি অ্যানথ্রাক্স।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. মোজাম্মেল হক জানান, পাশের পীরগাছা উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার ছিল, এখন সুন্দরগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঘাঘট ও তিস্তা নদীবেষ্টিত বামনডাঙ্গা, সর্বানন্দ, তারাপুর, বেলকা ও পৌরসভা এলাকায় এই সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছে। ইতোমধ্যে এসব এলাকায় টিকা প্রদান কার্যক্রম চলছে।
তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত পশুর পরিচর্যা করা বা জবাই করলে মানুষের শরীরে অ্যানথ্রাক্স ছড়াতে পারে। তবে মাংস খেলে এ রোগ ছড়ায় না। তাই কোনো অবস্থাতেই রোগাক্রান্ত পশু জবাই করা উচিত নয়।’
এদিকে, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজ কুমার বিশ্বাস। তিনি জানান, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সভা করে এলাকায় লিফলেট বিতরণ, মাইকিংসহ সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি আক্রান্ত পশু জবাই না করার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
খবরওয়ালা/টিএসএন



