গত শতকের এক অনন্য কীর্তিমান যাত্রাশিল্পী, অমলেন্দু বিশ্বাস—বাংলাদেশের যাত্রা মঞ্চে যিনি রেখে গেছেন এক অমলিন দাগ।
তিনি ১৯২৫ সালের, ২৯ মে মায়ানমারের ইয়াঙ্গুনে জন্মগ্রহণ করেন, পিতা: সুরেন্দ্র লাল বিশ্বাস মাতা: জ্ঞানদা দেবী পৈতৃক নিবাস: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার মসজিদিয়া গ্রাম।
শৈশবে ইয়াঙ্গুনে বেড়ে ওঠা অমলেন্দু বিশ্বাসের কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল এক ভিন্ন ধারায়। ১৯৪১ সালে প্রবেশিকা পাস করে তিনি যোগ দেন কলকাতার এয়ারফোর্সে। পরবর্তীতে কিছুদিন পুলিশে চাকরি করেন, পরে ১৯৪৪ সালে রবার্টসন কলেজ থেকে এফ.এ. পাস করেন।
১৯৪৭ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়েতে হিসাব রক্ষক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা ও সাংস্কৃতিক মননশীল এই মানুষটি বেশিদিন চাকরির গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে পারেননি। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। সেই সঙ্গে নাটক, গণসংগীত ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর টান ক্রমে তাঁকে নিয়ে যায় যাত্রাশিল্পের জগতে।
১৯৫০ সালে কয়েকজন সহযাত্রীকে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাবুল থিয়েটার’, যা পরবর্তীতে ‘বাবুল অপেরা’ নামে জননন্দিত যাত্রাদলে পরিণত হয়। রেলের চাকরি ছেড়ে তিনি সম্পূর্ণভাবে নিজেকে উৎসর্গ করেন বাংলার চিরায়ত যাত্রাশিল্পের বিকাশে।
স্বাধীনতার পর অমলেন্দু বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেন ‘চারণিক যাত্রাসমাজ’, যা পরে ‘চারণিক নাট্যগোষ্ঠী’ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
দীর্ঘ ২৭ বছরের নাট্যজীবনে তিনি অসংখ্য পৌরাণিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক পালায় অভিনয় ও নির্দেশনার মাধ্যমে নিজেকে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নট ও নির্দেশক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য যাত্রাপালা —‘মাইকেল মধুসূদন’, ‘একটি পয়সা’, ‘জানোয়ার’, ‘সম্রাট সাজাহান বাদশা’, ‘লেনিন ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘সোহরাব রুস্তম’, ‘অচল পয়সা’, ‘চাঁদ সুলতানা’, ‘রাহুগ্রাস’, ‘জালিয়াত’ প্রভৃতি।
যাত্রার ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে খ্যাত মঞ্জুশ্রী মুখার্জী ছিলেন তাঁর অধিকাংশ পালার নায়িকা। ১৯৭৮-৭৯ সালে তাঁর নির্দেশিত ও অভিনীত ‘মাইকেল মধুসূদন’ যাত্রাটি বিপুল প্রশংসা কুড়ায়।
১৯৭৯-৮০ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত যাত্রা উৎসবে পরপর দু’বার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান ও পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
তাঁর পরিবারও সংস্কৃতিচর্চায় সমুজ্জ্বল স্ত্রী জোৎস্না বিশ্বাস যাত্রা জগতের “যাত্রা সম্রাজ্ঞী” নামে পরিচিত, আর কন্যা অরুণা বিশ্বাস বাংলাদেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনেত্রী।
শিল্প-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
১৩ অক্টোবর ১৯৮৭, যাত্রা মঞ্চের এই কিংবদন্তি নটরাজ পর্দার আড়ালে চলে যান চিরদিনের জন্য।
স্মৃতির মঞ্চে তিনি আজও অমলিন—বাংলার যাত্রাশিল্পের ইতিহাসে চিরজাগরূক এক আলোকবর্তিকা।
খবরওয়ালা/এমএজেড



