“উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ”— এই একটি পংক্তিই যেন ধারণ করে তাঁর কবিতার তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, গভীর সামাজিক বোধ এবং সত্য উচ্চারণের সাহস।
বাংলা আধুনিক কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর, পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে এক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে। পিতা মুন্সী মোহাম্মদ মকবুলুর রহমান, মাতা আমেনা বেগম।
ঢাকার মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে।
১৯৪৯ সালে “উনপঞ্চাশের চিঠি” কাব্য দিয়ে কবিতাজগতে তাঁর আত্মপ্রকাশ, তবে প্রকৃত পরিচিতি আসে ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে”-এর মাধ্যমে।
জীবনানন্দ দাশ-পরবর্তী আধুনিক বাংলা কবিতার ধারায় তিনি অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হন তাঁর কাব্যের ভাষা, ছন্দ, রূপ ও মননের কারণে। প্রেম, মানবতা, স্বাধীনতা, স্বপ্ন, প্রতিবাদ—সবকিছুর মিশেলে গড়া তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে সময়ের দলিল।
স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর লেখা “স্বাধীনতার কবিতা”, “তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা” প্রভৃতি কবিতা সংগ্রামী মানুষের হৃদয়ে সঞ্চার করেছে নতুন শক্তি, নতুন প্রত্যয়।
তিনি শুধু কবি নন—ছিলেন এক জন বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সাহিত্য সম্পাদক। দীর্ঘদিন তিনি দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক সংবাদ, ও দৈনিক দেশ-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে —
“রৌদ্র করোটিতে”, “বন্দী শিবির থেকে”, “নীল দিগন্তে জ্বলে”, “স্মৃতির শহরে ঘর”, “উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ” ইত্যাদি।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা—
একুশে পদক (১৯৭৮), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯১), আনন্দ পুরস্কার, বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৯) সহ অসংখ্য স্বীকৃতি।
২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট, বাংলা সাহিত্যের এই মহান কবি আমাদের ছেড়ে চলে যান, রেখে যান এক অমর কাব্যজগৎ, যেখানে শব্দ ও সত্য একাকার হয়ে আছে।
শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি
শব্দের কারিগর, নগর কবি, মানবতার কবি,
শামসুর রাহমান —যাঁর কবিতায় বেঁচে আছে বাংলাদেশের চেতনা, স্বপ্ন ও মুক্তির গান।
খবরওয়ালা/এমএজেড



