একসময় বাংলাদেশের জলাশয়ে ‘আপদ’ হিসেবে পরিচিত কচুরিপানা আজ এক ধরনের সম্ভাবনার উৎসে পরিণত হয়েছে। দেখতে অর্কিড ফুলের মতো হলেও সাধারণ মানুষের কাছে এটি বেশ অচেনা। এক সময় এটি পানি ও জলাশয়ের জন্য ঝুঁকি হিসেবে ধরা হতো, কিন্তু বর্তমানে কচুরিপানা স্থানীয়দের জীবিকা ও হস্তশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইতিহাস অনুসারে, ১৮শ শতাব্দীর শেষভাগে এক ব্রাজিলীয় পর্যটক কচুরিপানা বাংলায় আনার পর তা দ্রুত দেশের প্রায় সব জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে দ্রুত বিস্তার পাওয়ায় অনেকেই এটিকে সমস্যা হিসেবে দেখলেও, এখন নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা এটিকে আয়ের সম্ভাবনায় রূপান্তর করছেন।
রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দের খোর্দ্দ মুরাদপুর গ্রামে বেগম রোকেয়ার জন্মভিটা সংলগ্ন বেগম রোকেয়া স্মৃতি হস্তশিল্প শোরুমে কচুরিপানার ডাঁটা ব্যবহার করে তৈরি করা হয় নানারকম হস্তশিল্প সামগ্রী। এখানে মোড়া, ফুলের টব, ফলঝুড়িসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি হয়।
| পণ্যের ধরন | দাম (টাকা) | ব্যবহার/লক্ষ্য |
|---|---|---|
| মোড়া | ১৫০–২৫০ | সজ্জা ও স্মারক |
| ফুলের টব | ২০০–৪০০ | গৃহসজ্জা |
| ফলঝুড়ি | ৩০০–৫৫০ | প্রাকৃতিক স্টোরেজ ও উপহার |
| অন্যান্য সামগ্রী | ২০০–৫০০ | সৌখিন ও হস্তশিল্প |
শোরুমের কর্ণধার মোসাম্মৎ পারভীন বেগম জানান, “অনেক বেকার তরুণ ও হতদরিদ্র নারী এই কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তাদের জীবনমান বদলাচ্ছে।”
বাংলা একাডেমি পরিচালিত বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের সহপরিচালক কৃষিবিদ আবিদ করিম মুন্না বলেন, কচুরিপানার ফুল, পাতা ও শিকড়ের বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। এটি পানি পরিশুদ্ধিকরণে কার্যকর, ভাসমান সবজি চাষে, মাছের খাদ্য ও জৈব সার উৎপাদনে সহায়ক। এছাড়া রাস্তার গর্ত পূরণ, নতুন সড়কের পানি ধরে রাখা ও সিমেন্টের খুঁটি শক্ত করার মতো কাজে ব্যবহৃত হয়।
স্বাস্থ্য উপকারিতার দিক থেকেও কচুরিপানা গুরুত্বপূর্ণ। এটি ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, একজিমা নিরাময় করে, চুল পরিষ্কার রাখে, দাঁত ও গলা ব্যথা কমায়, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, মাতৃদুগ্ধ বৃদ্ধি করে, অনিয়মিত ঋতুস্রাব ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং রক্তক্ষরণ বন্ধে কার্যকর।
বেগম রোকেয়া স্মৃতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, “একসময় যাকে ফেলনা মনে করা হতো, আজ সেই কচুরিপানা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য সম্পদে পরিণত হয়েছে।”
বর্তমানে কচুরিপানা কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি জীবিকা, স্বাস্থ্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে পরিচিত।



