চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর ভারতে নির্বাসিত প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনে বক্তব্য দিলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও বার্তার মাধ্যমে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানান।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান সরকারকে ‘অবৈধ ও সহিংস শাসনব্যবস্থা’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভয়, নৈরাজ্য ও গণতন্ত্রহীনতার এক অন্ধকার সময়ে প্রবেশ করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, দেশে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
অডিও বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউনূসকে একাধিকবার ‘খুনি’, ‘মহাজন’, ‘অর্থপাচারকারী’ ও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি আরো বলেন ইউনূস দেশের সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব বিদেশি স্বার্থের কাছে তুলে দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে উপস্থিত ছিলেন না। তবে সম্মেলনের শুরুতেই তার রেকর্ড করা অডিও বার্তা উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে প্রচার করা হয়। সেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক একাধিক মন্ত্রী ও দলটির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিত থাকতে দেখা যায়, যারা পরবর্তীতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন।
বক্তব্যের শুরুতেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ আজ এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।” তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘এক বিশাল কারাগার’ ও ‘মৃত্যুভয়ের আবহ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার অভিযোগ, রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র গণপিটুনি, লুটপাট ও চাঁদাবাজি বেড়ে গেছে এবং মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নেই।
তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। সেই সময় থেকেই দেশ সন্ত্রাস, দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথে হাঁটছে বলে তার অভিযোগ। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ধ্বংস করা হয়েছে এবং নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্বিঘ্নে চলতে দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ব্যক্তিগত আক্রমণের পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে’ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই এখন সময়ের দাবি।
অডিও বার্তায় তিনি দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে পাঁচ দফা দাবিও উত্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে- ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অপসারণ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি, সহিংসতা ও নৈরাজ্যের অবসান, নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়রানি ও গ্রেপ্তার বন্ধ করা।
সবশেষে গত এক বছরের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “সত্য উদঘাটন ছাড়া জাতির পুনর্মিলন সম্ভব নয়।”
এনডিটিভি মন্তব্য করেছে, এই বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে চলমান গভীর বিভাজনের চিত্রই তুলে ধরেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বর্তমান পরিস্থিতিকে সাধারণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন।








