অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে হারের বৃত্ত থেকে বের হতে পারল না বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে ৮ উইকেটে হেরে তিন ম্যাচের লড়াইয়ে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে নিগার সুলতানা জ্যোতির দল। ব্যাটিংয়ে শুরুতেই ধস, মাঝের ওভারে দুই ব্যাটারের প্রতিরোধ এবং শেষ দিকে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানো—সব মিলিয়ে বড় সংগ্রহ গড়তে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। অন্যদিকে, লক্ষ্য তাড়ায় অস্ট্রেলিয়ার দুই ব্যাটারের দায়িত্বশীল ইনিংসে সহজ জয় তুলে নেয় স্বাগতিকেরা।
বুধবার ব্রিসবেনে অনুষ্ঠিত ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। দলীয় স্কোর ১৮ রানে পৌঁছানোর আগেই সাজঘরে ফেরেন প্রথম তিন ব্যাটার। এমন বিপর্যয়ে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় সফরকারী দল। দ্রুত তিনটি উইকেট হারানোর পর ইনিংস সামাল দেওয়ার পাশাপাশি সম্মানজনক সংগ্রহ গড়ার চ্যালেঞ্জ সামনে আসে বাংলাদেশের ব্যাটারদের।
এ অবস্থায় দলের হাল ধরেন শারমিন আক্তার ও স্বর্ণা আক্তার। দুজনের অর্ধশতক বাংলাদেশকে বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে কিছুটা রক্ষা করে। তবে তাঁদের এই লড়াই সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
শারমিন আক্তার ৯৩ বলে ৫০ রান করেন। ধীরস্থির ব্যাটিংয়ে তিনি এক প্রান্ত আগলে রেখে ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, স্বর্ণা আক্তার ৭১ বলে ৫৪ রান করে দলের সংগ্রহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ওয়ানডে ক্রিকেটে এটি স্বর্ণার প্রথম অর্ধশতক। ব্যক্তিগতভাবে এটি তাঁর জন্য উল্লেখযোগ্য অর্জন হলেও দলের পরাজয়ের কারণে সেই ইনিংসের আনন্দ পূর্ণতা পায়নি।
শারমিন ও স্বর্ণার ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের ইনিংসে কিছুটা স্থিতি ফিরলেও বড় জুটি গড়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁদের বিদায়ের পর আবারও চাপে পড়ে দল। শেষ দিকে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকায় প্রত্যাশিত সংগ্রহের কাছাকাছিও যেতে পারেনি বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত ৪৯.৫ ওভারে ১৭২ রানে অলআউট হয় নিগার সুলতানার দল।
অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের মধ্যে মেগান স্কট ছিলেন সবচেয়ে সফল। মাত্র ১৬ রান খরচ করে চারটি উইকেট তুলে নেন তিনি। তাঁর নিয়ন্ত্রিত বোলিং বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে গুটিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। অ্যানাবেল সাদারল্যান্ডও দুটি উইকেট নিয়ে দলের বোলিং আক্রমণকে কার্যকর করেন। বাংলাদেশের ব্যাটাররা ব্যক্তিগতভাবে কয়েকটি ভালো প্রচেষ্টা চালালেও অস্ট্রেলিয়ার বোলিংয়ের ধারাবাহিকতা সামলাতে পারেননি।
পেরি-সাদারল্যান্ডের ব্যাটে সহজ জয় অস্ট্রেলিয়ার
১৭৩ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়াকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। শুরুতে দুটি উইকেট হারালেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ দ্রুত নিজেদের হাতে নিয়ে নেন এলিস পেরি ও অ্যানাবেল সাদারল্যান্ড। দুজনের অপরাজিত ইনিংসে বাংলাদেশের বোলারদের পক্ষে আর কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
পেরি অপরাজিত ৬৫ রান করেন। অন্য প্রান্তে সাদারল্যান্ডের ব্যাট থেকে আসে অপরাজিত ৭৪ রান। দুজনের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে অস্ট্রেলিয়া মাত্র দুই উইকেট হারিয়েই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায়। হাতে তখনও ১৬৪ বল বাকি ছিল। ম্যাচের ফলই দুই দলের ব্যাটিংয়ের পার্থক্য স্পষ্ট করে দেয়—বাংলাদেশ যেখানে ১৭২ রান তুলতে গিয়ে পুরো ৫০ ওভারও খেলতে পারেনি, অস্ট্রেলিয়া সেখানে দুই উইকেট হারিয়ে অনায়াসে লক্ষ্য পেরিয়ে যায়।
সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটিং দুর্বলতা স্পষ্ট
তিন ম্যাচের এই সিরিজে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। শেষ ম্যাচেও প্রথম দিকের উইকেট দ্রুত হারানোর কারণে দলকে শুরু থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করতে হয়েছে। শারমিন ও স্বর্ণার অর্ধশতক ব্যক্তিগত দক্ষতার পরিচয় দিলেও তাঁদের প্রচেষ্টা বড় দলীয় সংগ্রহ গড়ার জন্য যথেষ্ট হয়নি।
ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে শুরুতে উইকেট ধরে রাখা, মাঝের ওভারে কার্যকর জুটি গড়া এবং শেষ দিকে রান তোলার গতি বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইনিংসে এই তিনটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
এই হোয়াইটওয়াশ বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দলের জন্য হতাশাজনক ফল। তবে সিরিজের অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা চিহ্নিত করা, চাপের মধ্যে উইকেট ধরে রাখার কৌশল উন্নত করা এবং বড় দলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলার সক্ষমতা বাড়ানোই এখন গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত সাফল্যকে দলীয় অর্জনে রূপ দিতে পারলেই ভবিষ্যতে এমন সিরিজে ভালো ফলের সম্ভাবনা তৈরি হবে।


