বীমা খাতে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এখন বীমা কোম্পানির নথি ও সম্পদ সরাসরি তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা পেতে যাচ্ছে। এটি সম্ভব হবে বীমা আইন, ২০১০-এর প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে, যা দীর্ঘদিন ধরে বীমা খাতে অনিয়ম দমন ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।
তল্লাশি ও জব্দ ক্ষমতার মূল দিকসমূহ
সংশোধনী অনুযায়ী, যদি কোনো বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়ম, জালিয়াতি, বেআইনি কমিশন, অতিরিক্ত বা কম অর্থে দাবি নিষ্পত্তি বা অন্য কোনো আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে, আইডিআরএ অনুমোদিত কর্মকর্তাদের সরাসরি তল্লাশি ও জব্দ অভিযান চালাতে পারবে। কর্মকর্তারা প্রয়োজনে:
-
ভবনে প্রবেশ করতে পারবেন
-
লকার বা আলমারি খুলতে পারবেন
-
গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ এবং তার অনুলিপি তৈরি করতে পারবেন
-
পুলিশি সহায়তা প্রয়োজন হলে তা নিতে পারবেন
আইডিআরএ-এর চেয়ারম্যান অনুমোদিত কর্মকর্তাদের এই অভিযান চালানোর নির্দেশ দেবেন, এবং পুলিশকে সহায়তা দিতে বাধ্য করা হবে।
অনুসন্ধান ও নথি সংরক্ষণের নিয়ম
নতুন ধারায় বলা হয়েছে:
-
কোনো ব্যক্তি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়া অস্বীকার করলে বা গোপন করলে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে
-
জব্দ না করা গেলে নথি ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হবে
-
অনুসন্ধানের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শপথের অধীনে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে, এবং তার বক্তব্য আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হবে
-
জব্দকৃত নথি সাধারণত ১৮০ দিনের বেশি রাখা যাবে না; তদন্ত শেষে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে ফেরত দিতে হবে
-
নথি জব্দের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ থাকবে
বীমা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের তদারকি
প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে আইডিআরএ:
-
বীমা কোম্পানির অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ও ফাউন্ডেশন পরিদর্শন করতে পারবে
-
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে প্রতিবেদন দেবে
-
বীমা কোম্পানির সঙ্গে লেনদেনের তথ্য বা আর্থিক হিসাব সংগ্রহ করতে পারবে
বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতামত
বীমা বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি বীমা খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তবে অতিরিক্ত ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদারকি প্রয়োজন।
বীমা বিশেষজ্ঞ এসএম জিয়াউল হক বলেন, “আইডিআরএ যদি পুলিশের মতো ক্ষমতা পায়, তা কিছু লোকের লাভ হবে কিন্তু দেশের স্বার্থে কার্যকর হবে না।”
বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের এক পরিচালক বলেন, “আমরা সংস্কারের বিরোধী নই, কিন্তু জব্দের মতো ক্ষমতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করতে পারে।”
প্রস্তাবিত সংশোধনীর মূল লক্ষ্য
আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান ড. আসলাম আলম জানিয়েছেন, সংশোধনীটি মন্ত্রণালয়ের পর্যায়ে রয়েছে। সংস্কারের লক্ষ্য হলো:
-
বীমা খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা
-
গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি করা
-
বীমা ব্যবসার বিস্তার নিশ্চিত করা
সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বিষয় | মূল দিক |
|---|---|
| ক্ষমতা | তল্লাশি, নথি ও সম্পদ জব্দ |
| তদারকি | বীমা কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান, ফাউন্ডেশন |
| নথি সংরক্ষণ | সর্বোচ্চ ১৮০ দিন, ফেরত ৩০ দিনের মধ্যে |
| জিজ্ঞাসাবাদ | শপথে গ্রহণযোগ্য, আদালতে প্রমাণ |
| পুলিশ সহযোগিতা | বাধ্যতামূলক প্রয়োজনে |
| সম্ভাব্য ঝুঁকি | অতিরিক্ত ক্ষমতার অপব্যবহার, বিনিয়োগকারীর ভয় |
এই সংশোধনী কার্যকর হলে, বাংলাদেশে বীমা খাতের অনিয়ম, ভুয়া দাবি ও বেআইনি কমিশন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে আসার সম্ভাবনা বাড়বে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।



