আগামী বছর পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক হতে চায় এনসিসি

প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে শরিয়াহভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে বেসরকারি খাতের এনসিসি ব্যাংক। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে চারটি শাখাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তর করেছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি প্রচলিত ধারার আরও কয়েকটি শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালু এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের কার্যক্রম চলছে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আগামী বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরিত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ব্যাংকটি।

এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের রূপরেখা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়েছে এনসিসি ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে ধাপে ধাপে এই পরিবর্তন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রূপান্তরের অংশ হিসেবে ব্যাংকটির নামেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানা গেছে।

এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নূরুন নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই এনসিসি ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক হয়ে উঠুক। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যত নির্দেশনা আছে, তা মেনে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি আগামী বছরে পূর্ণ ইসলামি ব্যাংক হিসেবে রূপান্তর হবে এনসিসি ব্যাংক।’

এর আগে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক। রূপান্তরের পর স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের নাম হয় স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক পরিচিতি পায় গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক নামে। এনসিসি ব্যাংকও একই ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেলে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আসতে পারে।

৬২ শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর উদ্যোগ

ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৬২টি প্রচলিত শাখায় ‘ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো’ চালুর অনুমতি চেয়ে আবেদন করে এনসিসি ব্যাংক। এসব শাখায় প্রথমে উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা চালু করে পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে ব্যাংকটির।

ব্যাংকটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে আরও ৪০টি শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এনসিসি ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর ‘ইসলামিক ব্যাংকিং গুলশান শাখা’ চালুর মাধ্যমে ব্যাংকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২০ মার্চ চট্টগ্রামের মুরাদপুর শাখাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তর করা হয়। একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর ফেনী ও ঠাকুরগাঁও শাখায় পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে ব্যাংকটির আরও ৩২টি প্রচলিত শাখায় ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো চালু করা হয়।

উইন্ডো পদ্ধতিতে প্রচলিত ব্যাংকের কোনো শাখা থেকে আলাদা ব্যবস্থাপনায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে গ্রাহকেরা প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবা গ্রহণের সুযোগ পান। তবে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে শুধু সেবা চালু করাই যথেষ্ট নয়; ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রম, বিনিয়োগনীতি, হিসাব পরিচালনা ও অভ্যন্তরীণ তদারকির ব্যবস্থাও সংশ্লিষ্ট নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হয়।

আমানত ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা

এনসিসি ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমের আর্থিক চিত্রেও সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমে মোট আমানতের পরিমাণ ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিনিয়োগের জন্য আরও ৮০০ কোটি টাকার ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে ব্যাংকটি। সুকুক বন্ডে ব্যাংকটির বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৪৮ কোটি টাকা।

সুকুক হলো শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের একটি মাধ্যম, যা প্রচলিত সুদভিত্তিক বন্ডের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর কাঠামোতে সাধারণত কোনো সম্পদ, প্রকল্প বা নির্দিষ্ট বিনিয়োগ কার্যক্রমের সঙ্গে আর্থিক অধিকার যুক্ত থাকে। ইসলামি ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে সুকুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এনসিসি ব্যাংক জানিয়েছে, ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডোগুলোর মাধ্যমে তাদের ব্যবসার পরিধি ক্রমে বাড়ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে আমানত সংগ্রহের পাশাপাশি শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি, বিদ্যমান কার্যক্রম সমন্বয় এবং গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মকর্তা

পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করাকে গুরুত্ব দিচ্ছে এনসিসি ব্যাংক। এ লক্ষ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ইসলামি ব্যাংকিংয়ে অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক ফাইন্যান্সের (বিআইআইএফ) মাধ্যমে ৩৬৩ জন কর্মকর্তাকে ছয় দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অনলাইন ও সরাসরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মকর্তা ইসলামি ব্যাংকিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এখনো চলছে। পর্যায়ক্রমে ব্যাংকের সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ইসলামি ব্যাংকিং পরিচালনার ক্ষেত্রে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক চুক্তি, বিনিয়োগের নীতিমালা, আমানত ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান সম্পর্কে কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের কাঠামোগত পার্থক্য থাকায় নতুন ব্যবস্থায় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জনবলকে প্রস্তুত করা রূপান্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

ব্যাংকটির এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে। শাখাগুলোতে সেবা চালু করার পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার মতো প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রূপান্তরের অনুমোদন দেবে বলে তাঁরা আশা করছেন।

কেন ইসলামি ব্যাংক হতে আগ্রহী ব্যাংকগুলো

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আর্থিক সেবা গ্রহণের চাহিদার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগের সুযোগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রচলিত ব্যাংক ও ইসলামি ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদ জমা সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতায় পার্থক্য রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যাংকগুলোকে আমানতের ১৭ শতাংশ নগদ সংরক্ষণ অনুপাত (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই হার সাড়ে ৯ শতাংশ। ফলে সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

তবে এ ধরনের সুবিধা থাকলেই একটি ব্যাংকের জন্য ইসলামি ধারায় রূপান্তর সহজ হয়ে যায় না। রূপান্তরের সময় বিদ্যমান আমানত ও বিনিয়োগের কাঠামো সমন্বয়, শরিয়াহসম্মত পণ্য ও সেবা চালু, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা ও ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

এনসিসি ব্যাংকের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে এসব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়া। শাখা রূপান্তর, ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডোর সম্প্রসারণ, প্রশিক্ষণ এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার কাজ কতটা কার্যকরভাবে এগোয়, তার ওপর নির্ভর করবে ব্যাংকটির পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়ন। আগামী বছর এই পরিবর্তন সম্পন্ন হলে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে ইসলামি ধারায় রূপান্তরের তালিকায় এনসিসি ব্যাংকও যুক্ত হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।