সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার এবং দেশের অভ্যন্তরে শত শত কোটি টাকার নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট নতুন অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, ডিসি পদায়নসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত এই বিশাল অংকের অর্থ বিদেশ পাঠনোর অভিযোগগুলো বর্তমানে চলমান অনুসন্ধানের সাথে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।
রোববার সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ। তিনি জানান, সাবেক এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে পর্তুগাল, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডের সুইস ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ গড়ার তথ্য সংবলিত অভিযোগ জমা পড়েছে। নতুন এসব নথি আসিফের বিরুদ্ধে পূর্ব থেকেই চলমান অনুসন্ধানের সাথে একীভূত করে বিস্তৃত তদন্ত চালানো হবে।
দুদকের নথি ও প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা এবং ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে আব্দুল সালামকে বসাতে ১০ কোটি টাকাসহ কেবল চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতেই মোট ১৮৭ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের স্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে প্রতি পদ থেকে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া, ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ-বদলিতে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিবরণও অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ এবং ক্রীড়া খাতের প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়িয়ে হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির এই নেতার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ৩য় ধাপে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ানোসহ নিজ উপজেলা কুমিল্লার মুরাদনগরে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব অনিয়মের পাশাপাশি ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার ভ্রমণ, পাঁচ তারকা হোটেলের বিল পরিশোধ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের চিত্রও দুদকের নথিতে স্থান পেয়েছে।
বিদেশি ব্যাংক ও বিনিয়োগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দুদকের নথিতে যে চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের খতিয়ান পাওয়া গেছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
| দেশের নাম | অভিযোগে বর্ণিত পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ | পাচার ও বিনিয়োগের ধরন/মাধ্যম |
| দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) | ৪,৫০০ কোটি টাকা | ‘গ্রিন গ্রুপে’ বিনিয়োগ ও আবাসন |
| সিঙ্গাপুর | ৩,০০০ কোটি টাকা | অবৈধ লেনদেন ও ব্যাংকিং চ্যানেল |
| অস্ট্রেলিয়া | ২,০০০ কোটি টাকা | সম্পদ ও রিয়েল এস্টেট খাতের বিনিয়োগ |
| সুইজারল্যান্ড | ১,৫০০ কোটি টাকা | সুইস ব্যাংকের গোপনীয় অ্যাকাউন্ট |
| মোট চার দেশে পাচার | ১১,০০০ কোটি টাকা | পারিবারিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রেরণ |
দুদক সূত্রে জানা গেছে, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাঠাতে আসিফ তাঁর দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নেকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অপরদিকে আসিফের বাবা বিল্লাল হোসেন, এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন এবং পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে প্রভাবিত করে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং ঘুষের তদবির চালানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে দুদক কর্মকর্তা তানজির আহমেদ স্পষ্টভাবে জানান, পুরো বিষয়টি এখন নিবিড় অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। অপরাধমূলক এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা ও আইনি দায়ভাজ অনুসন্ধানের অগ্রগতি শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।


