উজিরপুরে চুরির অভিযোগে যুবককে রাতভর খুঁটিতে বেঁধে রাখার অভিযোগ

বরিশালের উজিরপুরে চুরির অভিযোগে অনিক সরদার নামে এক যুবককে রাতভর খুঁটির সঙ্গে হাত-পা বেঁধে রাখার এবং নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে উপজেলার বামরাইল বাজারে এ ঘটনা ঘটে। পরদিন সকালে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা বাবাকে তাঁর নয় বছর বয়সী মেয়ে নিজের হাতে চা ও রুটি খাওয়ানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বামরাইল বাজারের একটি খুঁটির সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছেন অনিক সরদার। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে ছোট্ট মেয়েটি। কিছুক্ষণ পর শিশুটি বাজারের একটি দোকান থেকে চা ও বানরুটি কিনে আনে। এরপর বাবার কাছে গিয়ে নিজের হাতে তাঁকে চা ও রুটি খাওয়াতে থাকে। এ সময় আশপাশে কয়েকজন মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

ভিডিওটির এই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে চুরির অভিযোগের সত্যতা যাচাই বা আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের বদলে একজন ব্যক্তিকে রাতভর প্রকাশ্যে বেঁধে রাখার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শিশুটির কান্না এবং বাবাকে খাবার খাওয়ানোর দৃশ্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, অনিক সরদারের বাড়ি বামরাইল বাজারের অদূরে কালিহাতি গ্রামে। শুক্রবার দিবাগত রাতে বামরাইল বাজারের একটি মুদি দোকানে চুরির চেষ্টা করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। পরে বাজারের নৈশপ্রহরী ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা তাঁকে আটক করেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

আটকের পর তাঁকে পুলিশের কাছে না দিয়ে বাজারের একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগ। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, সারা রাত তিনি ওই অবস্থাতেই ছিলেন। তাঁর ওপর নির্যাতন চালানোরও অভিযোগ উঠেছে। তবে নির্যাতনের ধরন কী ছিল, কারা এতে জড়িত ছিলেন কিংবা ঠিক কতক্ষণ তাঁকে বেঁধে রাখা হয়েছিল—এসব বিষয়ে পুলিশ এখনো বিস্তারিত তথ্য জানায়নি।

পরদিন সকালে বাবাকে আটকে রাখার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে তাঁর নয় বছরের মেয়ে। বাবাকে দীর্ঘ সময় ধরে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় দেখে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরে স্থানীয় একটি দোকান থেকে চা ও রুটি কিনে এনে বাবাকে নিজের হাতে খাওয়ায়। ঘটনাস্থলে থাকা কেউ সেই দৃশ্য ভিডিও করেন। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

শিশুটির এই আচরণই দ্রুত ঘটনাটির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি দেখে অনেকে শিশুটির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন এবং একই সঙ্গে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির দাবি জানান। তবে অনিক সরদারের বিরুদ্ধে ওঠা চুরির অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে এখনো কোনো চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু পুলিশ পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়রা অনিক সরদারকে ছেড়ে দেন। ফলে পুলিশ তাঁকে আটক অবস্থায় পায়নি।

উজিরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক ফারুক হোসেন বলেন, খবর পেয়ে শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে পুলিশ সেখানে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়রা অনিক সরদারকে মুক্ত করে দেন।

পুলিশ পরিদর্শক আরও জানান, ঘটনাটির বিস্তারিত তথ্য জানতে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। চুরির অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা কী, যুবককে কীভাবে আটক করা হয়েছিল এবং তাঁকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখার ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ঘটনাটি ঘিরে মূলত দুটি আলাদা প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, অনিক সরদারের বিরুদ্ধে যে চুরির অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটির সত্যতা কী। দ্বিতীয়ত, অভিযোগ সত্য হলেও তাঁকে আটকে রেখে রাতভর বেঁধে রাখা বা নির্যাতন করার মতো ঘটনা ঘটেছে কি না এবং এতে কারা জড়িত।

চুরির অভিযোগের বিচার করার এখতিয়ার স্থানীয় বাসিন্দাদের নয়; অভিযোগের তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি শুধু একটি শিশুর বাবার প্রতি মমতার দৃশ্যই সামনে আনেনি, একই সঙ্গে অভিযোগের বিচার করতে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

পুলিশের তদন্ত শেষ হলে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।