দেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে ঋণ নবায়নের (Loan Renewal) প্রচলিত কঠোর নিয়মে বড় ধরনের শিথিলতা এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত মঙ্গলবার (৩ মার্চ) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। নতুন এই নির্দেশনার ফলে ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নীতিগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট ও নতুন নির্দেশনা
গত আট মাস আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি কঠোর নির্দেশনা জারি করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে—সীমাতিরিক্ত ঋণ (Excessive Loan) সম্পূর্ণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত কোনো ঋণ নবায়ন করা যাবে না। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সেই নির্দেশনাটি বাতিল করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ঋণ যদি মন্দ মানে খেলাপি (Bad/Loss Category) না হয়, তবে তা নবায়ন করা যাবে। অর্থাৎ, খেলাপি হওয়ার আগ পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা তাদের ঋণ নবায়নের সুযোগ পাবেন। এই বিশেষ সুবিধাটি আগামী ২০২৭ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে জানানো হয়েছে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে বড় শিল্প গ্রুপগুলো তাদের চলতি মূলধনের সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।
নবনিযুক্ত গভর্নরের প্রথম বড় সিদ্ধান্ত
ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি ব্যবসায়ীদের জন্য দুটি বড় ধরনের সুবিধার ঘোষণা দিলেন। তার এই দ্রুত সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক সাড়া লক্ষ্য করা গেছে। নিচে গত মঙ্গলবারের নেওয়া প্রধান সিদ্ধান্তসমূহ সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:
| তারিখ | গৃহীত পদক্ষেপসমূহ | লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য |
| ৩ মার্চ ২০২৬ | ঋণ নবায়নের নিয়ম শিথিলকরণ | সীমাতিরিক্ত ঋণ পরিশোধ ছাড়াই নবায়নের সুযোগ (২০২৭ পর্যন্ত)। |
| ৩ মার্চ ২০২৬ | রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিশেষ ঋণ | ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধের জন্য এক বছর মেয়াদি ঋণ। |
| ৩ মার্চ ২০২৬ | খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পুনর্বিবেচনা | মন্দ মানে খেলাপি হওয়ার আগ পর্যন্ত নবায়ন সুবিধা প্রদান। |
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বেতন সহায়ক ঋণ
মঙ্গলবারের নির্দেশনায় শুধু ঋণ নবায়নই নয়, বরং দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত—রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারখানার শ্রমিক ও কর্মচারীদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধের জন্য উদ্যোক্তারা এক বছর মেয়াদি বিশেষ ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান সময়মতো পেমেন্ট না পাওয়ায় বেতন পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছিল। এই ঋণ সুবিধা চালুর ফলে শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ কমবে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্ন থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতি পরিবর্তনের ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর কিছুটা চাপ বাড়লেও ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা বাড়বে। সীমাতিরিক্ত ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা না থাকায় বাজারে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই শিথিলতার ফলে যাতে প্রকৃত ঋণখেলাপিরা অনৈতিক সুবিধা না পায়, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।
প্রশাসক ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৭ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘমেয়াদি শিথিলতা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেশের শিল্পায়নকে গতিশীল করতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।



