বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে বহর আধুনিকায়নের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী অক্টোবরেই এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকার এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোচ্ছে এবং অক্টোবরে এ নিয়ে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। এর আগে জুলাইয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং চুক্তির পর ক্রয়মূল্য ও অন্যান্য শর্ত প্রকাশ করা হবে।
এয়ারবাসের প্রস্তাবটি বাংলাদেশ বিমানের বহরে বিভিন্ন নির্মাতার উড়োজাহাজ রাখার একটি পরিকল্পনার অংশ। আলোচনায় থাকা প্রস্তাব অনুযায়ী ১০টি উড়োজাহাজের মধ্যে চারটি A350-900 এবং ছয়টি A321neo থাকার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত চুক্তিতে উড়োজাহাজের সংখ্যা, মডেল, মূল্য, সরবরাহের সময়সূচি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত নির্ধারিত হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের সঙ্গে চলতি বছর বাংলাদেশ বিমানের দুটি ক্রয়চুক্তি হয়েছে। সর্বশেষ ২৩ সেপ্টেম্বর আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা আসে। এর আগে এপ্রিল মাসে ১৪টি উড়োজাহাজের জন্য চুক্তি হয়েছিল। দুই দফার চুক্তি মিলিয়ে বোয়িংয়ের কাছ থেকে বাংলাদেশ বিমানের অর্ডার দাঁড়িয়েছে ২৫টি উড়োজাহাজে। নতুন ১১টির মধ্যে পাঁচটি Boeing 787-10 Dreamliner এবং ছয়টি Boeing 737-8 মডেলের উড়োজাহাজ।
মন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের ব্যাখ্যাও দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষর করা এবং উড়োজাহাজ হাতে পাওয়া একই বিষয় নয়। সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে পর্যায়ক্রমে হবে। এপ্রিলের ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে সরবরাহ ২০৩১ সাল থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং সাম্প্রতিক ১১টি যুক্ত হওয়ার পর পুরো অর্ডারের সরবরাহও দীর্ঘ সময়জুড়ে চলবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমান ক্রয়পরিকল্পনা শুধু তাৎক্ষণিক উড়োজাহাজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নয়। আগামী কয়েক দশকে দেশের বিমান পরিবহন খাতের সম্ভাব্য চাহিদা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ বিমানের বহর সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, কোন নির্মাতার কোন মডেলের উড়োজাহাজ বাংলাদেশের জন্য উপযোগী হবে, সেটি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজের ধরন, পরিচালনাগত প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ বহর ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
এয়ারবাসের সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিমানের বহরে ইউরোপীয় নির্মাতার উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বিমানবহরে বোয়িংয়ের আধিপত্য রয়েছে। ফলে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত হলে ভবিষ্যতে বিমানকে একাধিক নির্মাতার উড়োজাহাজ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনার বিষয়ও সমন্বয় করতে হবে।
বিমান চলাচল খাত সম্প্রসারণের যুক্তি তুলে ধরে মন্ত্রী ইথিওপিয়ার উদাহরণও দেন। তাঁর বক্তব্য, তুলনামূলকভাবে কম জিডিপির দেশ হয়েও ইথিওপিয়ার জাতীয় এয়ারলাইনস বড় বহর পরিচালনা করছে এবং দেশটির অর্থনীতিতে বিমান চলাচল খাতের অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ খাতের সম্ভাবনাকে আরও কাজে লাগানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার, লাভজনক রুট পরিচালনা, দক্ষ জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা এবং পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি ১১টি বোয়িং কেনার পর বিমান বহর সম্প্রসারণ নিয়ে এমন বিষয়গুলো নিয়েই বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হলে তা বোয়িংয়ের সাম্প্রতিক ক্রয়চুক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশের বিমান খাতে একটি বড় বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হবে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর এবং এর আর্থিক ও বাণিজ্যিক শর্ত প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটির মোট ব্যয়, অর্থায়ন কাঠামো এবং সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সূচি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না।


