এলএনজি আমদানির নির্ধারিত কার্গো সময়মতো দেশে আনতে না পারা এবং একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে নতুন করে তীব্র গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) সমন্বয়হীনতা, অব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
পেট্রোবাংলার অধীন আরপিজিসিএলের ওপর দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি, খালাস এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোর কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির গাফিলতির কারণে একটি এলএনজি কার্গো ফেরত পাঠাতে হয়েছে। একই সঙ্গে ১৭ আগস্ট আরেকটি নির্ধারিত কার্গো দেশে আনা সম্ভব হয়নি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায়। সরবরাহ প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাওয়ায় ১৯ আগস্ট থেকে নতুন করে সংকট তীব্র হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বর্তমান পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল। নতুন এলএনজি কার্গো দেশে না আসা পর্যন্ত সংকট উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনাও কম। এ কারণে আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল ইসলাম এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন দলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ ঘটনাগুলো পরিকল্পিতভাবে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর অংশ কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন তথ্য নেই।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ২১ জুলাই একটি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা যথেষ্ট দৃশ্যমান ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলাকে পরিস্থিতি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য জানানো হয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আরামকোর কাছ থেকে একটি পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ কার্গোতে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কার্গোটি খালাসে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি অস্বীকৃতি জানালে শেষ পর্যন্ত সেটি ফেরত পাঠাতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ঝুঁকির বিষয়টি জানা থাকা সত্ত্বেও কেন ওই কার্গো আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এরপর নিয়মিত ঠিকাদারের পরিবর্তে পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠানকে এলএনজি আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে একের পর এক ঘটনায় এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার দায় আরপিজিসিএল এড়াতে পারে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি। পরে কলব্যাকও করেননি। মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এলএনজি সংকটের পেছনে শুধু সাম্প্রতিক আমদানি জটিলতাই নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়াও বড় কারণ। একসময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো। বর্তমানে তা কমে প্রায় ১ হাজার ৬২৬ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্রগুলোর একটি বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়া বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বিবিয়ানার অংশ প্রায় ৪৫ শতাংশের বেশি। কনডেনসেট সরবরাহেও ক্ষেত্রটির অবদান প্রায় ৬৮ শতাংশ। একসময় বিবিয়ানা থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও ২০ আগস্ট তা কমে ৭৩৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
গত ২১ জুলাই একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে প্রায় ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক গ্রাহকদের ওপর চাপ তৈরি হয়। ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু করলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল।
কিন্তু ১৩ আগস্ট থেকে এলএনজি সরবরাহের ঘাটতি আবারও সংকট বাড়াতে শুরু করে। সর্বশেষ ১৯ আগস্ট এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এলএনজি সংকটের কারণে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পরবর্তী কার্গো ২৩ আগস্টের দিকে দেশে পৌঁছাতে পারে। তার আগে সরবরাহ পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতির সম্ভাবনা কম।
গ্যাসের এই ঘাটতির প্রভাব ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়ছে। অনেক এলাকায় রান্নার চুলায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানার বয়লার, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অন্যান্য উৎপাদনমুখী কার্যক্রমেও গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
দেশের গ্যাস ব্যবস্থার বর্তমান সংকট তাই কেবল একটি কার্গো সময়মতো না আসার ঘটনা নয়। একদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দ্রুত কমছে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য সমন্বয়হীনতাও বড় ঘাটতি তৈরি করছে। ফলে ভবিষ্যতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশীয় উৎপাদন, এলএনজি আমদানি, টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।


