তীব্র গ্যাস সংকটে ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলের উৎপাদনব্যবস্থা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে কাজে যোগ দেওয়ার পরও ২০টি কারখানার শ্রমিকদের ধাপে ধাপে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। দুপুরের খাবারের সময়ের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শ্রমিককে কারখানা থেকে বাড়ি পাঠানো হয়।
শিল্প পুলিশ-৫-এর পুলিশ সুপার মো. আনছার উদ্দিন জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ভালুকা শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ না থাকায় শ্রমিকরা কারখানায় উপস্থিত হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০টি কারখানার শ্রমিকদের দুপুরের খাবারের সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ছুটি দেওয়া হয়। অন্য কারখানাগুলোতেও উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলে মোট ২৯৩টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৯৯টি কারখানা গ্যাসনির্ভর। বর্তমানে প্রায় সব গ্যাসচালিত কারখানাই সরবরাহ সংকটের কারণে সমস্যায় পড়েছে। শিল্পাঞ্চলের প্রধান কারখানাগুলোতে গড়ে উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
পৌর এলাকা ও তিতাস গ্যাসের কার্যালয়ের আশপাশের কিছু কারখানায় তুলনামূলকভাবে গ্যাসের চাপ পাওয়া গেলেও দূরের প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি আরও খারাপ। অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ একেবারেই থাকছে না। ফলে উৎপাদন সচল রাখতে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ ও নিজস্ব জেনারেটরের ওপর নির্ভর করার চেষ্টা করছে। তবে বিকল্প ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বস্ত্র ও সুতা উৎপাদনকারী কারখানাগুলো। গৌরীপুরের টয়ো স্পিনিং মিলসে মোট ৫০টি যন্ত্রের মধ্যে ৪৩টি বন্ধ রাখতে হয়েছে। বাকি সাতটি যন্ত্র বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চালানো হচ্ছে। ভালুকার সীমা স্পিনিং মিলসের ৩০টি যন্ত্রই পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
বাশার স্পিনিং, নরটেক্স টেক্সটাইল ও ডেল্টা স্পিনার্সেও উৎপাদন ৫০ শতাংশ বা তার বেশি কমেছে। এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইলে স্বাভাবিক গ্যাসের চাপ না থাকায় ৪০ শতাংশ যন্ত্র বন্ধ রয়েছে। সিরামিক শিল্পের এক্সিলেন্ট সিরামিকসের চুল্লি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।
শিল্প পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার গোপীনাথ কাঞ্জিলাল বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করে। সাধারণত কারখানাগুলো বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত উৎপাদন কার্যক্রম চালায়। কিন্তু গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে দুপুরের খাবারের সময় মাহাদি সোয়েটার্স, সুলতানা সোয়েটার্স, লিজ ফ্যাশন, টিএম টেক্সটাইল, ত্রিশাল টেক্সটাইল ও বিএসপি স্পিনিং মিলসহ ২০টি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়।
ভালুকার গ্লোরি টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলসের উপযোগিতা বিভাগের ব্যবস্থাপক সোহেল আহাম্মেদ জানান, প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ধরে তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ কম। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে যেখানে ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ১১ থেকে ১২ পিএসআই। এর ফলে কারখানাটির উৎপাদন ৩ থেকে ৪ শতাংশ কমেছে।
তিতাস গ্যাসের ময়মনসিংহের ভালুকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (পদ্ধতি পরিচালনা) শামীম হোসেন বলেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসের চাপও কমেছে। ভালুকা এলাকায় ১৪০ ও ৫০ পিএসআই ক্ষমতার দুটি পৃথক লাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে ওই এলাকায় ৩০ থেকে ৫০ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাসের এই সংকট শুধু শিল্পকারখানার উৎপাদনেই প্রভাব ফেলছে না, শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইলের শ্রমিক হাফিজা আক্তার জানান, গ্যাসের অভাবে সব যন্ত্র একসঙ্গে চালানো যাচ্ছে না, ফলে কাজও কমে গেছে। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতেও গ্যাসের সংকট থাকায় রান্নাবান্নার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন কমে যাওয়া, যন্ত্র বন্ধ রাখা এবং শ্রমিকদের নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি দেওয়ার ঘটনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি করেছে। বৃহস্পতিবারের পরিস্থিতিতে সেই সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন পরিস্থিতি আরও চাপে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।


