দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছে শক্তিশালী এক ভূমিকম্প। ভয়াবহ এই ভূকম্পনে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন নাগরিক আহত হয়েছেন। মারাত্মক এই কম্পনের পরপরই সম্ভাব্য শক্তিশালী পরাঘাতের (আফটারশক) আশঙ্কায় পুরো অঞ্চলজুড়ে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ১২টা ৩৪ মিনিট ও বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩৪ মিনিট) ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭.৪। ভূগর্ভস্থ ভূ-প্রকৃতির কারণে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯৬ কিলোমিটার গভীরে। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ (ইউএসজিএস) জানায়, এই ভূকম্পনের উপকেন্দ্র ছিল সান হোসে দেল পালমার গ্রামের প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্বে এবং এর গভীরতা ছিল প্রায় ১১০ কিলোমিটার।
ভূমিকম্পটির গভীরতা অনেক বেশি হলেও এর প্রভাব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। উৎপত্তিস্থল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দেশটির রাজধানী বোগোতাতেও প্রবল কম্পন অনুভূত হয়। কম্পন শুরু হতেই বোগোতার বহুতল ভবনগুলো থেকে মানুষজন আতঙ্কে রাস্তায় নেমে আসেন এবং দ্রুত নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। দেশটির প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম কারাকোল রেডিওর সাংবাদিকেরা জানান, সরাসরি সম্প্রচার চলাকালেই তাঁদের স্টুডিওর ভারী আসবাবপত্র বিকট শব্দে কাঁপতে থাকে, যা বোগোতায় ভূমিকম্পের তীব্রতার ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের বিখ্যাত কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত মানিজালেস শহর ও চোকো প্রদেশ। চোকো প্রদেশের গভর্নর নুবিয়া ক্যারোলিনা কর্দোবা নিশ্চিত করেছেন যে ভূমিকম্পে বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তবে দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে হতাহতের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান এখনো স্পষ্ট নয়।
জাতীয় দৈনিক ‘এল তিয়েম্পো’ প্রকাশিত মানিজালেস শহরের দৃশ্যচিত্রে দেখা যায়, ভূমিকম্পের তোড়ে একাধিক ভবন তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না, তা জানতে স্থানীয় মানুষজনকে চিৎকার করে অনুসন্ধান চালাতে দেখা যায়। শহরের একাধিক ঐতিহাসিক গির্জার সুউচ্চ চূড়া ভেঙে মাটিতে পড়ে গেছে এবং পথপাশের উঁচু ভবনগুলোতে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।
স্থলভাগের পাশাপাশি দেশের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। কলম্বিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেরেইরা, মানিজালেস, কিবদো, আরমেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেনতুরা সহ অন্তত ছয়টি আঞ্চলিক বিমানবন্দরের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বিমান চলাচল ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে নাকি আংশিক চালু আছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশ ভেনেজুয়েলা যখন মাত্র দুই মাসের কম সময় আগে দুই দফা শক্তিশালী ভূমিকম্পের ভয়াবহ ক্ষত সামলে ওঠার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই কলম্বিয়ায় এই মহাবিপর্যয় নেমে এলো। উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলার সেই সাম্প্রতিক জোড়া ভূমিকম্পে ৬ হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। প্রতিবেশী দেশের সেই স্মৃতি এখনো তাজা থাকায় কলম্বিয়ার সাধারণ মানুষের মাঝে পরাঘাত নিয়ে অতিরিক্ত মানসিক আতঙ্ক কাজ করছে।
বর্তমানে উদ্ধারকারী দল এবং জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করেছে। ধ্বংসস্তূপে কেউ আটকা পড়েছেন কি না তা খুঁজে বের করার পাশাপাশি ফাটল ধরা ভবনগুলো ব্যবহারের উপযোগী আছে কি না তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। একই সাথে স্থানীয় প্রশাসন অধিবাসীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।



