মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীতে ঐতিহ্যবাহী ও জাকজমকপূর্ণ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার বিকেলে জেলা শহরের বেউথা ঘাট এলাকায় কালীগঙ্গার বুক চিরে আয়োজিত এই বাইচে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দৃষ্টিমনোহারী সব নৌকা অংশ নেয়। মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত গ্রামবাংলার আবহমান কালের এই লোকজ উৎসবে নদীর দুই কূলে ঢল নেমেছিল লাখো উৎসুক জনতার।
এবারের নৌকাবাইচে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মোট ২২টি ঐতিহ্যবাহী নৌকা চারটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। কুড়িগ্রামের রৌমারী, টাঙ্গাইলের নাগরপুর, পাবনার সাঁথিয়া ছাড়াও মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার সারেং ও মাঝিমাল্লারা তাদের সুসজ্জিত নৌকা নিয়ে এই প্রতিযোগিতায় নামেন। শক্তিমত্তা ও পেশির লড়াইয়ের পাশাপাশি বাইচে অংশ নেয় খেল্লা-গয়ইটা, ঘাসি-ছিপা, ছান্দি ও পানসি নৌকা। এসব বিশালাকার নৌকার পাশাপাশি দর্শকদের বাড়তি বিনোদন জোগাতে প্রতিযোগিতা করে ৭০ ও ৮০ হাত দীর্ঘ দুটি ব্যতিক্রমী কলাগাছের ভেলা।
বাইচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ খেল্লা নৌকা ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বাগুয়ারচর গ্রামের দল ‘মায়ের দোয়া’। দীর্ঘ ও কঠিন পথ অতিক্রম করে এসে এই জয় ছিনিয়ে নেওয়ায় প্রশংসায় ভাসছে তারা। চ্যাম্পিয়ন হিসেবে মায়ের দোয়া দলটি উপহার পেয়েছে একটি ১০০ সিসি মোটরসাইকেল। অন্যদিকে এই ক্যাটাগরিতে রানার্সআপ হয়ে ১৬ সিএফটি ফ্রিজ জিতে নেয় টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ‘মা-বাবার দোয়া’ নৌকা।
ঘাসি নৌকা ক্যাটাগরিতে এক নাটকীয় ফাইনালে যৌথভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার দুটি দল—‘বাইমাইল এক্সপ্রেস’ ও ‘কালাম সিকদার এক্সপ্রেস’। এই দুই দল যৌথভাবে ১০০ সিসি মোটরসাইকেল পুরস্কার লাভ করে।
ছান্দি নৌকা ক্যাটাগরিতে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের ‘গায়ান বাড়ি’ নৌকা। পুরষ্কার হিসেবে তারা জিতেছে একটি আকর্ষণীয় ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল। এই ক্যাটাগরিতে রানার্সআপ হয়ে ১৬ সিএফটি ফ্রিজ পেয়েছে ঘিওরের ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’।
পানসি নৌকা ক্যাটাগরিতে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল জিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ‘জাগীর জনতা এক্সপ্রেস’। আর রানার্সআপ হিসেবে ১৬ সিএফটি ফ্রিজ অর্জন করেছে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ‘আজম ব্রাদার্স’।
পুরো আয়োজনের বিভিন্ন ক্যাটাগরির বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী নৌকার তালিকা নিচে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্যাটাগরি / বিভাগ | স্থান / মর্যাদা | নৌকার নাম | প্রাপ্তি / দলগত পরিচয় | প্রাপ্ত পুরস্কার |
| খেল্লা নৌকা | চ্যাম্পিয়ন | মায়ের দোয়া | রৌমারী, কুড়িগ্রাম | ১০০ সিসি মোটরসাইকেল |
| খেল্লা নৌকা | রানার্সআপ | মা-বাবার দোয়া | নাগরপুর, টাঙ্গাইল | ১৬ সিএফটি ফ্রিজ |
| ঘাসি নৌকা | যৌথ চ্যাম্পিয়ন | বাইমাইল এক্সপ্রেস | সিংগাইর, মানিকগঞ্জ | ১০০ সিসি মোটরসাইকেল |
| ঘাসি নৌকা | যৌথ চ্যাম্পিয়ন | কালাম সিকদার এক্সপ্রেস | সিংগাইর, মানিকগঞ্জ | ১০০ সিসি মোটরসাইকেল |
| ছান্দি নৌকা | চ্যাম্পিয়ন | গায়ান বাড়ি | হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ | ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল |
| ছান্দি নৌকা | রানার্সআপ | ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ | ঘিওর, মানিকগঞ্জ | ১৬ সিএফটি ফ্রিজ |
| পানসি নৌকা | চ্যাম্পিয়ন | জাগীর জনতা এক্সপ্রেস | মানিকগঞ্জ সদর | ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল |
| পানসি নৌকা | রানার্সআপ | আজম ব্রাদার্স | সাঁথিয়া, পাবনা | ১৬ সিএফটি ফ্রিজ |
| বিশেষ অংশগ্রহণ | বিশেষ পুরষ্কার | ৫টি সাধারণ নৌকা | বিভিন্ন অঞ্চল | ১১ সিএফটি ফ্রিজ (প্রতিটি) |
| বিশেষ অংশগ্রহণ | সান্ত্বনা পুরস্কার | ৭টি সাধারণ নৌকা | বিভিন্ন অঞ্চল | ৮ সিএফটি ফ্রিজ (প্রতিটি) |
| যেমন খুশি সাজো | বিশেষ বিনোদন | মেধার ভিত্তিতে বাছাই | ব্যক্তি ও নৌকা | টিভি, প্রেসার কুকার ও রাইস কুকার |
প্রতিযোগিতায় বিজয়ী দলগুলোর পাশাপাশি বাইচে অংশ নেওয়া আরও পাঁচটি নৌকাকে ১১ সিএফটি ফ্রিজ এবং সাতটি নৌকার প্রতিনিধিদের দেওয়া হয় ৮ সিএফটি করে ফ্রিজ। এছাড়া ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ ক্যাটাগরিতে অংশ নেওয়া সুসজ্জিত নৌকা ও শিল্পীদের মাঝে টেলিভিশন, প্রেসার কুকার ও রাইস কুকার বিতরণ করা হয়।
ইভেন্ট শেষে বেউথা ঘাট প্রাঙ্গণে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধান অতিথি মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য, খাদ্যমন্ত্রী ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম রিতা। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর, জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম, নৌকাবাইচ পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আ তা ম জহীর আলম খান লোদী এবং সদস্য-সচিব মাসুদ পারভেজ সহ স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ।
নৌকাবাইচে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়ে নেওয়া কুড়িগ্রামের ‘মায়ের দোয়া’ দলের গল্পটি ছিল সত্যিই রোমাঞ্চকর। শাল কাঠ দিয়ে তৈরি ৮০ ফুট দীর্ঘ এই নৌকাটির এটিই ছিল প্রথম কোনো প্রতিযোগিতায় নামা। দীর্ঘ এক বছরের চেষ্টায় প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে তৈরি করা নৌকাটি মানিকগঞ্জের বাইচে অংশ নিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে রওনা দেয়। ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে নানা নদী পথ পেরিয়ে মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গায় পৌঁছাতে তাদের লেগেছে টানা তিন দিন। এত দূর পথ পাড়ি দিয়ে এসে চ্যাম্পিয়ন হতে পেরে উচ্ছ্বসিত নৌকার পরিচালক মজিবুর রহমান ও তাঁর পুরো দল।
শরতের মনোরম বিকেলে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে কালীগঙ্গার দুই তীরে জমে উঠেছিল জমজমাট গ্রামীণ মেলা। নদীর পাড়, ব্রিজের উপর ও আশপাশের ভবনের ছাদে বসে এবং দাঁড়িয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা লাখ লাখ মানুষ তাল মেলায় কাঁসার ঘণ্টা আর মাঝিদের গানের সুরে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এমন মিলনমেলায় উৎসবের রঙ ছড়ায় মানিকগঞ্জজুড়ে।


