দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আদলে কোনো অভিযান চালানোর পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে কোনো বিশেষ যৌথ বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্তও হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নতুন সদর দপ্তরের শুভারম্ভ ফলক উন্মোচন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ যৌথ বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা সরকারের নেই। একইভাবে অতীতে পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো কোনো বিশেষ অভিযান চালানোর বিষয়েও সরকার চিন্তাভাবনা করছে না।
তিনি বলেন, নতুন কোনো বাহিনী গঠনের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানগুলো কোনো নতুন বিশেষ বাহিনী গঠনের অংশ নয়। পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং আনসারসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এসব কার্যক্রম সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও জোরদার করা হবে বলে তিনি জানান।
নতুন বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেই
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কোনো যৌথ বাহিনী গঠন করা হচ্ছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সরকারের অবস্থান হলো, বিদ্যমান বাহিনীগুলোর সক্ষমতা ও পারস্পরিক সমন্বয় বাড়িয়েই অপরাধ দমনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া।
পুলিশ, আনসারসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে আরও সক্রিয় ও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই এই তৎপরতার মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
কেন ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ
‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ইতিহাসে একটি বহুল আলোচিত অভিযান। ২০০২ সালের অক্টোবরে তৎকালীন সরকার অপরাধ দমনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী ওই অভিযান শুরু করে। এতে ৪০ হাজারের বেশি সামরিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল বলে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অভিযানটি প্রায় ৮৫ দিন স্থায়ী হয় এবং এ সময় ১০ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছিল। হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে, যা পরে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ ও সমালোচনার কারণ হয়।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ওই অভিযানের সময় আটক, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগও উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে অভিযানসংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ডের দায় থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—যা নিয়েও মানবাধিকার মহলে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই বর্তমান সময়ে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো কোনো অভিযান হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৃহস্পতিবারের বক্তব্য সেই সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করেছে।
চলমান অভিযানই হবে মূল কৌশল
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সরকারের বর্তমান কৌশলের একটি দিক স্পষ্ট হয়েছে। নতুন কোনো বাহিনী তৈরি না করে বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হবে। বিভিন্ন বাহিনী নিজেদের আইনগত দায়িত্বের মধ্যে থেকে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করবে।
সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর তৎপরতা বাড়ানোর আলোচনা চলছে। বিশেষ করে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সমন্বিত অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির প্রয়োজন বিবেচনায় এসব অভিযান আরও জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যদের আরও সক্রিয় ও তৎপর থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই অবস্থানে একদিকে যেমন ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো বিশেষ অভিযান পুনরায় চালুর সম্ভাবনা নাকচ করা হয়েছে, অন্যদিকে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন কোনো বিশেষ কাঠামো তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান বাহিনীগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমের ওপরই আপাতত জোর দেওয়া হচ্ছে।
তেজগাঁওয়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নতুন সদর দপ্তরের শুভারম্ভ ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে এ অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাকে সামনে রেখে পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে আরও সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


