বাঙালি হয়েও বিশ্ববিজ্ঞানকে অগাধ সমৃদ্ধ করা কিংবদন্তি স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর প্রতি আজও গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ। বিজ্ঞান, দর্শন, উদ্ভিদবিদ্যা ও উদ্ভাবন—এই চার সমান্তরাল জগতে তাঁর পদচিহ্ন এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যে তাঁকে সহজে এক-দুটি পরিচয়ে বেঁধে রাখা অসম্ভব। তিনি ছিলেন একাধারে গবেষক, উদ্ভাবক, চিন্তাবিদ ও শিক্ষক—যাঁর হাতে বাঙালি মেধা সত্যিকারের বৈশ্বিক পরিচয় পায়।
উদ্ভিদেও প্রাণ আছে—প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রমাণ
উদ্ভিদের জীবনীশক্তি ও অনুভূতির সক্ষমতা নিয়ে তাঁর গবেষণা বিশ্ববিজ্ঞানে এক নতুন দ্বার উন্মোচন করে। তিনি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ক্রেসকোগ্রাফ উদ্ভাবন করেন, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও প্রতিক্রিয়া সূক্ষ্মভাবে মাপতে সক্ষম। তাঁর আবিষ্কার সেই সময়ের বিজ্ঞানজগতে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিলেও পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা পায়।
বেতার তরঙ্গ গবেষণায় যুগান্তকারী অবদান
আজকের রেডিও, ওয়াই-ফাই, মাইক্রোওয়েভ—এই সব প্রযুক্তির শেকড়েও রয়েছে তাঁর গবেষণা।
১৮৯৫ সালেই তিনি কলকাতায় মাইক্রোওয়েভ সংকেত পাঠানোর প্রদর্শনী করেন, যা সমসাময়িক অনেক ইউরোপীয় উদ্ভাবকের চেয়েও আগে। সেই সময় ব্যবহার করা তাঁর মাইক্রোওয়েভ রিসিভার ও ট্রান্সমিটার আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির ভিত্তি গঠনে বিশাল ভূমিকা রাখে।
তাঁর গবেষণা ও উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সম্মাননা লাভ করেন, যা একজন উপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে বসবাসকারী বাঙালি বিজ্ঞানীর জন্য ছিল অভূতপূর্ব অর্জন।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর ময়মনসিংহে জন্ম নিলেও তাঁদের আদি বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের রাঢ়িখালে। পিতা ভগবানচন্দ্র বসুর স্বদেশি চিন্তা, মানবিকতা ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি শৈশবেই তাঁকে গড়ে তোলে কৌতূহলী ও উদার চিন্তার মানুষ হিসেবে।
সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল ও কলেজে পড়ালেখা শেষে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি সম্পন্ন করে বৈজ্ঞানিক গবেষণা তাঁকে পুরোপুরি আকৃষ্ট করে।
অর্জনসমূহ
১৮৯৪–১৮৯৬: বৈদ্যুতিক তরঙ্গ নিয়ে গভীর গবেষণা
১৮৯৬: ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে ‘নাইট’ উপাধি
১৯২০: রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত
১৯২৭: ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সভাপতি
১৯২৮: ভিয়েনা একাডেমি অব সায়েন্সের করসপন্ডিং সদস্য
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর তিনি পৃথিবী ছেড়ে গেলেও তাঁর অবদান আজও প্রযুক্তি, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় অমলিন।
বাঙালি হয়েও বিশ্বকে সমৃদ্ধ করা এই মহান বিজ্ঞানীর আলো মানবসভ্যতাকে পথ দেখিয়ে যাচ্ছে এখনও।
খবরওয়ালা/এসজে



