গাজার অর্ধেক ভূখণ্ড ইসরায়েলের দখলে, নিজ ভূমিতে পরবাসী ফিলিস্তিনিরা

গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গত মার্চে হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এরপর থেকে ক্রমাগতভাবে নিজেদের দখলদারি বিস্তার করছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ)। বর্তমানে গাজার প্রায় ৫০ শতাংশ অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে নিজেদের ভূমিতেই পরবাসীর মতো জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সেনারা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও অবকাঠামো গুঁড়িয়ে ফেলে সেসব এলাকা বসবাসের অযোগ্য করে তোলা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই তথাকথিত ‘বাফার জোন’ বা সামরিক নিরাপত্তা এলাকার পরিধি দ্বিগুণ করেছে ইসরায়েল।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর হামাসের হাতে আটক কিছু জিম্মি সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময় মুক্তি পায়। তবে বাকিদের মুক্তির চাপ প্রয়োগের অজুহাতে ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রাখে এবং গাজার ভূমিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে।

মানবাধিকার সংগঠন ও গাজা-সংক্রান্ত বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসরায়েল এখন গাজার উত্তর ও দক্ষিণ ভাগে বিভাজন সৃষ্টি করে এক দীর্ঘমেয়াদি দখলদারি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি জানিয়েছেন, হামাস পরাজিত হলেও গাজায় ইসরায়েল নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে এবং ফিলিস্তিনিদের সেই অঞ্চল থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হবে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-কে পাঁচজন ইসরায়েলি সেনা জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বাফার জোন সম্প্রসারণ ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সেনা বলেন, ‘যা কিছু পেয়েছে, তা ধ্বংস করেছে। যেখানে কোনো কার্যকর প্রতিরোধ দেখেছে, সেখানেই গুলি চালিয়েছে। যেন কিছুই না থাকে ফিলিস্তিনিদের ফেরার মতো।’

সোমবার (৭ এপ্রিল) ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’ নামক দখলবিরোধী এক ভেটেরান্স গ্রুপ সেনাদের বর্ণনার ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা বলেছে, পরিকল্পিত ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে ইসরায়েল ভবিষ্যতে দখল প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অবশ্য বলছে, তারা ৭ অক্টোবরের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায় হামাস।

Z গাজার অর্ধেক ভূখণ্ড ইসরায়েলের দখলে, নিজ ভূমিতে পরবাসী ফিলিস্তিনিরা
ছবি: এপি

বিভক্ত গাজা

‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর তথ্যমতে, যুদ্ধের শুরুর দিকে সীমান্তসংলগ্ন গাজার এক কিলোমিটারের বেশি এলাকায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়ে সেখানে থাকা স্থাপনা গুঁড়িয়ে ‘বাফার জোন’ গড়ে তোলে সেনারা।

তারা আরও জানায়, ইসরায়েল ‘নেতজারিম করিডোর’ নামে পরিচিত গাজার মধ্যাঞ্চলের এক বিশাল এলাকা দখল করেছে, যা গাজার উত্তরাঞ্চলকে বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। উপত্যকাটিতে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বসবাস করে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক মানচিত্রে দেখা গেছে, গত মাসে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর তারা বাফার জোনের পরিধি দ্বিগুণ করে, কোথাও কোথাও তা তিন কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।

বেন গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়াকভ গার্ব জানান, নেতজারিম করিডোর ও বাফার জোন মিলিয়ে গাজার কমপক্ষে ৫০ শতাংশ এলাকা দখলে রয়েছে। ইসরায়েল এখন দক্ষিণ গাজায় নতুন একটি করিডোর তৈরি করতে চায়, যা রাফাহ শহরকে অন্য অংশ থেকে আলাদা করে দেবে।

Z গাজার অর্ধেক ভূখণ্ড ইসরায়েলের দখলে, নিজ ভূমিতে পরবাসী ফিলিস্তিনিরা
ছবি: এপি

বাফার জোন এখন ‘কিল জোন’

ইসরায়েলি সেনাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাফার জোনের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। তবে যেসব ফিলিস্তিনি এই এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করেছেন, তাদের গুলি করা হয়েছে।  

এক সেনা জানান, একটি সাঁজোয়া বুলডোজার দিয়ে মাটি সমান করে তারা ‘কিল জোন’ তৈরি করেছে। ট্যাংকের ৫০০ মিটারের মধ্যে কেউ এলেই গুলি করা হয়। এমনকি নারী ও শিশুও এই হামলার শিকার হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সেনা ৭ অক্টোবরের হামলার প্রতিশোধ নিতে এসব করছে। আমি বুঝি, আমরা শুধু তাদের হত্যা করছি না—তাদের পরিবার, শিশু, পশু-পাখিও মেরে ফেলছি। তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করছি।’

সেনাবাহিনী বলেছে, তারা চেষ্টা করছে বেসামরিক প্রাণহানি যতটা সম্ভব এড়াতে এবং আক্রমণ চালাচ্ছে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, ২০২৩ সালের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫০ হাজার ৬৯৫ জন ফিলিস্তিনি, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। এ ছাড়া, পোলিও টিকা না পাওয়ায় গাজার ৬ লাখ ২ হাজার শিশু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।

 

সূত্র: এপি, ইউএনবি

 

খবরওয়ালা/আরডি

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।