অগ্নিযুগের বিপ্লবীকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার,
আজ ২৩ সেপ্টেম্বর। ১৯৩২ সালের এই দিনে মাত্র ২১ বছর বয়সে আত্মবলিদান দিয়েছিলেন অগ্নিযুগের বিপ্লবীকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার—বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নারী বিপ্লবী।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তখন অত্যন্ত বিরল। সেই প্রতিকূল সময়ে প্রীতিলতা শুধু বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্তই হননি, প্রয়োজন হলে জীবন বিসর্জন দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়েও পুরুষ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
১৯১১ সালে চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী। চট্টগ্রামের খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯২৯ সালে ঢাকা বোর্ডের অধীন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরবর্তীতে কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনেই তাঁর মধ্যে দেশপ্রেম ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে। নারী সংগঠন ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তিনি বৃহত্তর স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে এগিয়ে যান। চট্টগ্রামে ফিরে তিনি নন্দনকানন অপরনাচরণ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু শিক্ষকতার নিরাপদ জীবন তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। দেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে টেনে নেয় বিপ্লবের কঠিন পথে।
পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ দপ্তর ধ্বংসের পরিকল্পনা, জালালাবাদ যুদ্ধসহ বিভিন্ন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা জানা যায়। এক পর্যায়ে ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারি ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় তাঁকে আত্মগোপনে যেতে হয়।
পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ
১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে সূর্য সেনের নির্দেশে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রীতিলতার ওপর। তৎকালীন ঔপনিবেশিক বর্ণবাদী মানসিকতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল ক্লাবটি। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল সেই বহুল আলোচিত বৈষম্যমূলক নির্দেশনা—“Dogs and Indians not allowed”।
সেদিন পুরুষের পোশাকে বিপ্লবী দলের নেতৃত্ব দিয়ে প্রীতিলতা ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণ পরিচালনা করেন। বিপ্লবীরা ক্লাবে আক্রমণ চালানোর পর ব্রিটিশ পুলিশের পাল্টা প্রতিরোধের মুখে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে প্রীতিলতা গুলিবিদ্ধ ও ঘেরাও অবস্থায় পড়েন। গ্রেপ্তার হয়ে বিপ্লবী সহযোদ্ধাদের তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তিনি সঙ্গে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন এবং আত্মবলিদান দেন।
মাত্র ২১ বছরের এক তরুণী—জীবনের অসংখ্য সম্ভাবনাকে পেছনে ফেলে দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে সামনে রেখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন। তাঁর আত্মবলিদান তৎকালীন বিপ্লবী সমাজে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের স্বাধীনতাকামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
প্রীতিলতার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি লিঙ্গ, শ্রেণি কিংবা বয়সের সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। একটি পরাধীন দেশের মুক্তির স্বপ্নে একজন তরুণীও যে কতখানি সাহস, আত্মত্যাগ ও দৃঢ়তার পরিচয় দিতে পারেন, প্রীতিলতা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তিনি ছিলেন না কেবল একজন নারী বিপ্লবী; তিনি ছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদী চেতনার এক দীপ্ত প্রতীক।
আজ তাঁর আত্মহুতি দিবসে অগ্নিযুগের সেই সাহসী কন্যাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।
বিপ্লবীকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার—
আপনার আত্মত্যাগ বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিনম্র শ্রদ্ধা।
লাল সালাম।


