গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এখন আর শুধু শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে খাদ্য, পরিবহন, পোলট্রি, নির্মাণসহ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে। উৎপাদন ব্যয় বাড়া, সরবরাহ কমে যাওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কারখানায় বারবার উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে একের পর এক নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। একই সঙ্গে অনেক পণ্যের প্যাকেটের আকার ছোট হয়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের প্রকৃত ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে অনেক প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মগবাজারে তিনটি দোকান ঘুরে এক লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৯৫ টাকায় কিনতে হয়েছে গৃহিণী রেশমা আক্তারকে। ১৫-২০ দিন আগেও একই পরিমাণ তেল ১৮০ টাকায় পাওয়া যেত। কেন দাম বাড়ল—এ প্রশ্নের জবাবে দোকানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দিকে ইঙ্গিত করেন।

কারওয়ান বাজারেও একই ধরনের চিত্র। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে এক কেজি চিনির দাম ১১০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা হয়েছে বলে জানান বেসরকারি চাকরিজীবী আকরাম হোসেন। তাঁর ভাষায়, চাল বাদে গত কয়েক সপ্তাহে প্রায় সব প্রয়োজনীয় পণ্যের দামই বেড়েছে। এর সঙ্গে মোটরসাইকেলের জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় পরিবারের মাসিক বাজেটে চাপ আরও বাড়ছে।

খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন, সরবরাহ পর্যায়ে দাম বাড়ার প্রভাব তাদের ওপর সরাসরি পড়ছে। কারওয়ান বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, ৫০ কেজি চিনির বস্তার দাম পরিবেশকেরা এক দিনের ব্যবধানে প্রায় ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। ফলে বাড়তি খরচ ক্রেতার ওপর না চাপিয়ে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাজারে

মহেশখালীর একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর কয়েক সপ্তাহ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও চাপে পড়ে। প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিল্পকারখানাগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন চালাতে পারছে না।

এর প্রভাব সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে জমা হচ্ছে। কারখানায় উৎপাদন কমলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে যেসব শিল্পে তাপ, বিদ্যুৎ বা গ্যাস সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে সংকটের প্রভাব তুলনামূলক বেশি।

ভোজ্য তেলের বাজারেও সরবরাহের চাপ স্পষ্ট। সরকার খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৮০ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৭৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বাজারের কিছু অংশে খোলা তেল ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাম তেলের দামও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কিছুটা বেশি।

রিফাইনারদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আনুষ্ঠানিকভাবে দাম বাড়ানো হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আটা, ময়দা, ডাল ও দুধেও বাড়তি চাপ

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। খোলা আটা বর্তমানে কেজিপ্রতি প্রায় ৪৫-৫০ টাকা এবং প্যাকেটজাত আটা ৬৫-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা ময়দার দাম উঠেছে ৬৫-৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৭৫-৮৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

বিভিন্ন ধরনের ডালের দাম কেজিতে প্রায় ৫-১০ টাকা বেড়েছে। ব্র্যান্ডভেদে গুঁড়া দুধের দাম কেজিতে ২০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কিছু পণ্যের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৯৬০ টাকাতেও পৌঁছেছে। গত দুই মাসে পোলাও চালের দামও কেজিতে প্রায় ৫০-৮০ টাকা বেড়েছে।

কারওয়ান বাজারের এক বিক্রেতা জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যান্য তেলও চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ হচ্ছে বলে তাঁর দাবি।

লোডশেডিংয়ে বিপাকে পোলট্রি খাত

বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পোলট্রি খাতেও। প্রায় দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকার বাজারে এক ডজন ডিমের দাম ১৩০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪৫-১৫০ টাকা হয়েছে। ব্রয়লার মুরগির দামও কেজিপ্রতি প্রায় ১৮০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।

খামারিরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত গরমে মুরগির মৃত্যুহার বেড়েছে। হ্যাচারিতে ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের জন্য দীর্ঘ সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়, আর ডিজেলের বাড়তি দাম সেই বিকল্প ব্যবস্থাকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল করে তুলেছে।

ফলে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে সরবরাহ কমছে। এই দুই চাপ একসঙ্গে বাজারে ডিম ও মাংসের দাম বাড়াচ্ছে।

পণ্যের আকার ছোট, দাম একই বা বেশি

ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ার আরেকটি লক্ষণ হলো পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া। বাজারে এমন কয়েকটি পণ্য দেখা যাচ্ছে, যেগুলোর প্যাকেটের ওজন কমলেও দাম অপরিবর্তিত থাকছে বা উল্টো বাড়ছে।

প্রায় এক মাস আগে ৩০০ গ্রামের একটি সাবানের দাম ছিল ৪০ টাকা। এখন ওজন কমিয়ে ২৭৫ গ্রাম করা হলেও দাম রাখা হয়েছে ৪০ টাকা। একইভাবে ২০০ গ্রামের একটি চুলের তেলের বোতল কমিয়ে ১৯০ গ্রাম করা হয়েছে, অথচ দাম ২০ টাকা বেড়েছে।

ডিটারজেন্টের ক্ষেত্রেও দাম বেড়েছে। একটি ব্র্যান্ডের প্রতি কেজির দাম প্রায় ২০ টাকা বেড়ে ১৬৫ টাকা এবং আরেকটির দাম ১৫ টাকা বেড়ে ১৯৫ টাকা হয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের মতে, সাবান ও বিস্কুটসহ আরও কিছু পণ্যের প্যাকেটের আকার ছোট করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

নির্মাণ ও শিল্পে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

গ্যাসের স্বল্পচাপ ও বিদ্যুৎ সংকট সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে জ্বালানি-নির্ভর শিল্পগুলোকে। গ্যাস সরবরাহের সমস্যায় ৯০০টির বেশি টেক্সটাইল মিল উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি। তৈরি পোশাক, ইস্পাত, কাগজ ও সিরামিক শিল্পেও উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় কমে গেছে।

ইস্পাত শিল্পে পরিস্থিতি আরও কঠিন। সাধারণ সময়ে উৎপাদন ব্যয়ের একটি অংশ গ্যাস ও বিদ্যুৎ বাবদ ব্যয় হলেও উৎপাদন কমে গেলে একই স্থায়ী খরচ কম উৎপাদিত পণ্যের ওপর বেশি চাপ তৈরি করে। ফলে প্রতি ইউনিট উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যায়।

শিল্পসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে প্রতি টন রড উৎপাদনে প্রায় ৪-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চললে অনেক কারখানার টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সিমেন্ট শিল্পেও গত এক মাসে উৎপাদন ব্যয় অন্তত ১০ শতাংশ বেড়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব। ভারী যন্ত্রপাতি বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সমস্যায় বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় পূর্ণ সক্ষমতায় আনতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। এতে শুধু উৎপাদনই কমে না, যন্ত্রপাতি চালু ও বন্ধ করার অতিরিক্ত ব্যয়ও যুক্ত হয়।

প্লাস্টিক ও সিরামিক শিল্পও গ্যাসের কম চাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারায় বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

পরিবহন ব্যয়ও যোগ করছে নতুন চাপ

গ্যাস সংকটের প্রভাব নগর পরিবহনেও দেখা যাচ্ছে। এলিফ্যান্ট রোড থেকে বাড্ডা যাওয়ার জন্য যেখানে সাধারণত ৩০০-৩৫০ টাকা ভাড়া চাওয়া হয়, সেখানে একজন সিএনজি অটোরিকশাচালক ৫০০ টাকা দাবি করেন।

চালকের দাবি, গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে এবং দিনে ছয়-সাত ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। গাড়ির মালিককে দৈনিক নির্ধারিত জমা দেওয়ার পর জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে বাড়তি ভাড়া দাবি করাকে তিনি আয় ধরে রাখার উপায় হিসেবে দেখছেন।

এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, জ্বালানি সংকটের প্রভাব কীভাবে উৎপাদনকেন্দ্র থেকে পরিবহন হয়ে সরাসরি ভোক্তার ঘাড়ে গিয়ে পড়ে।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জন্য সংকটটি কেবল পণ্যের দাম বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একই অর্থ দিয়ে কম পণ্য কিনতে হচ্ছে, কোথাও প্যাকেটের পরিমাণ কমছে, কোথাও সরবরাহ অনিয়মিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বাড়তি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের কথা বলছেন, আর শিল্পকারখানাগুলো কম সক্ষমতায় চলছে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ অর্থনীতির আরও বিস্তৃত অংশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার যে সমস্যা শিল্প খাত থেকে শুরু হয়েছিল, তার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন বাজার ও পারিবারিক বাজেটে।

Tags :

Shakib

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।