খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 2শে ভাদ্র ১৪৩২ | ১৭ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান সম্প্রতি জুলাই সনদের সমন্বিত খসড়া পড়েছেন এবং এই বিষয়ে তার মতামত প্রকাশ করেছেন।
রবিবার (১৭ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্টে এই অভিমত জানিয়েছেন। বার্গম্যান বহু বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লিখছেন। তিনি লিখেছেন—
‘আমি সবে ২৭ পৃষ্ঠার জুলাই সনদের একটি অনানুষ্ঠানিক ইংরেজি সংস্করণ পড়লাম, যা বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে পাঠানো হয়েছে। এই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য প্রতিফলিত হওয়ার কথা। আমার কিছু ভাবনা রয়েছে:
১. এটি একটি জটিল নথি এবং বোঝার জন্য সময় লাগবে। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, অধিকাংশ প্রস্তাবই সাধারণ বুদ্ধিতে গ্রহণযোগ্য প্রগতিশীল সংস্কার। এগুলোর লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন করা এবং প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কমানো। এতে এমন সংস্কার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা সংবিধান সংস্কারে আগ্রহী বেশিরভাগ মানুষই সমর্থন করবেন।
২. আমি লক্ষ্য করেছি, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ অংশে একধরনের কৌশলী অস্পষ্টতা রাখা হয়েছে। মূলনীতিগুলোর মধ্যে বর্তমানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত আছে। এই শব্দটি ইসলামি ডানপন্থীদের আক্রমণের মুখে রয়েছে, যারা বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও প্রভাবশালী।
সনদের ৭ অনুচ্ছেদে প্রস্তাব করা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ অংশে অন্তর্ভুক্ত হবে ‘সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়, গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’। আমার মনে হয়েছে, এটি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দ বাতিলের প্রস্তাব নয়; বরং নতুন শব্দগুলো অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। যদি আমার বোঝা ঠিক হয়, তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্কের মীমাংসা ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের হাতে থাকবে, যা ইতিবাচক।
৩. সংসদের দ্বিতীয় কক্ষ গঠনের লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রীর এবং যেকোনো নতুন সরকারের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এটি হয়তো ঠিকই করবে, তবে বাস্তবে কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। রাজনীতিবিদদের সংখ্যা বাড়ানো বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানের অংশ কি না, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
৪. নথির শেষ অংশে এটি সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে, এমনকি বর্তমান সংবিধানেরও ওপরে উঠে। বিষয়টি যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের ইচ্ছা রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়, এবং যেহেতু ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিমূলক দলিল, তাই এটি ‘দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছার একটি সুস্পষ্ট ও সর্বোচ্চ প্রকাশ’।
সনদে কিছু ইতিবাচক সংস্কার থাকতে পারে, যা রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনও পেয়েছে। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে এর কিছু বা বেশির ভাগ সংস্কার বাস্তবায়িত হবে। তবে এই প্রক্রিয়াকে ‘জনগণের ইচ্ছার সর্বোচ্চ প্রকাশ’ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এই ঐকমত্য হয়েছে একগুচ্ছ অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে, যাদের অনেকগুলো খুব ছোট, যারা ২০০৮ সালের পর থেকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে কখনো পরীক্ষিত হয়নি বা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তাদের একমত হওয়া ‘জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ’ হিসেবে ধরা হাস্যকর, আর সংবিধান অতিক্রম করা উচিত, এমন ভাবাটাও সম্পূর্ণ ভুল।
৫. সনদটির প্রস্তাবনা জুলাই ঘোষণার তুলনায় অনেক সংযমী ও কম পক্ষপাতমূলক। তবে মূল লেখার কিছু বিষয় আমার সমালোচনার দাবি রাখে।
প্রথমত, এতে বলা হয়েছে, ‘১ হাজার ৪০০ জনের বেশি নিরস্ত্র নাগরিক নিহত হয়েছেন’। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় প্রায় ৮৫০ জন নিহতের তথ্য রয়েছে। যদিও এই তালিকায় আরও ৫০–১০০ মৃত্যু যোগ হতে পারে, তবুও ‘১ হাজার ৪০০ জনের বেশি’ বলা সম্ভবত অতিরঞ্জিত। জাতিসংঘের প্রতিবেদনও এই সংখ্যা নিশ্চিত করে না; উল্লেখ করা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হতে পারে, যার মধ্যে ৫২ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং কিছু নিহত ঘটনা আওয়ামী লীগের কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক জুলাই ঘোষণাপত্রে নিহতের সংখ্যা ‘প্রায় এক হাজার’ উল্লেখ করা হয়েছে। সনদটি সংশোধন করে নিহত সংখ্যা জুলাই/ আগস্ট ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা উচিত। আহতদের সংখ্যা ব্যবহৃত হওয়া উচিত শুধু সেইসব ব্যক্তির তথ্যের ওপর যারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরকারি পরিসংখ্যানে আছে।
দ্বিতীয়ত, সনদে ২০০৯–২৪ সালের আওয়ামী লীগ আমলের উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, তারা রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী ও সমালোচকদের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার হরণ করেছিল, রাষ্ট্রীয় মদদে গুম, হত্যা, নিপীড়ন-নির্যাতন, মামলা-মোকদ্দমা ও হামলার মাধ্যমে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও ভীতির রাজত্ব কায়েম করেছিল। ২০০৯ সালে পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ড এবং ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড এর প্রধান উদাহরণ।
আমার মতে, ‘নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও ভয়ের রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠার দাবি কিছুটা অতিরঞ্জিত। মূল উদ্বেগ বিডিআর হত্যাকাণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে। এটি কীভাবে আওয়ামী লীগের ‘নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও ভয়ের রাজত্বের’ অংশ হতে পারে, তা স্পষ্ট নয়। সরকারীভাবে কোনো প্রমাণ নেই যে এটি ইচ্ছাকৃত হত্যার অংশ ছিল; সম্ভবত অব্যবস্থাপনার কারণে ঘটেছিল। সনদে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম, হত্যা, নিপীড়ন-নির্যাতন, মামলা এবং আক্রমণের প্রমাণ উল্লেখ আছে। তাই পিলখানার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করার প্রেক্ষাপট আরও সাবলীলভাবে বিবেচনা করা উচিত।’
খবরওয়ালা/এন