জেন্ডার বৈষম্য ও বয়স: প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে মালাইকা অরোরার অবস্থান

বলিউডের গ্ল্যামার জগতে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের আধিপত্য ধরে রেখেছেন মালাইকা অরোরা। নব্বইয়ের দশকের ‘ছঁইয়া ছঁইয়া’ থেকে শুরু করে ‘মুন্নি বদনাম’ কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের ‘পয়জন বেবি’—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর নাচের ছন্দ এবং শারীরিক সৌন্দর্যের জাদুতে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। বর্তমানে ৫২ বছর বয়সে পদার্পণ করলেও তাঁর ফিটনেস এবং গ্ল্যামার আজও বিনোদন জগতের অন্যতম চর্চিত বিষয়। তবে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বারবার তাঁকে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে—বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি কীভাবে নিজেকে ধরে রেখেছেন? সম্প্রতি ‘দ্য রাইট অ্যাঙ্গেল শো’ নামক একটি টক শোতে অংশ নিয়ে মালাইকা বয়স, নারীত্ব এবং সমাজের দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে নিজের স্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ অবস্থান তুলে ধরেছেন।


বয়স নিয়ে মালাইকার ব্যক্তিগত উপলব্ধি

সাক্ষাৎকারে মালাইকার কাছে জানতে চাওয়া হয়, দীর্ঘ সময় ধরে নিজের সৌন্দর্য ও ফিটনেস বজায় রাখার পথে বয়স বাড়ার বিষয়টি তাঁকে কোনোভাবে ভাবিত করে কি না। উত্তরে অভিনেত্রী অত্যন্ত পরিণত মানসিকতার পরিচয় দিয়ে জানান যে, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বয়সের গুরুত্ব তাঁর কাছে পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি বলেন:

“একটা সময় ছিল যখন আমি বয়স নিয়ে চিন্তিত থাকতাম। কিন্তু আমার জীবনে এমন পর্যায়ও এসেছে যখন আমি এই সংখ্যাটি নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত হইনি। আমি কেবল আমার কাজ উপভোগ করার দিকে মনোনিবেশ করি। যা করতে ভালোবাসি, বর্তমানে আমি তা-ই করছি। আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমি জীবনের সবচেয়ে সুখী এবং ইতিবাচক সময় অতিবাহিত করছি।”

মালাইকার মতে, বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র। জীবনে এখনো তাঁর অনেক লক্ষ্য পূরণের বাকি আছে এবং নতুন কিছু করার তাড়না তাঁকে সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখে। তাই বয়সের ঊর্ধ্বগতি তাঁর মানসিক অবস্থার ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে না।


সামাজিক বৈষম্য ও জেন্ডার ডাইনামিক্স

মালাইকা অরোরা তাঁর সাক্ষাৎকারে সমাজে বিদ্যমান লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে একজন নারীর জীবনের গতিপথ বা সফলতাকে মূল্যায়ন করার ধরন একজন পুরুষের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সমাজ এবং গণমাধ্যম যেভাবে একজন নারীর বয়সের সাথে তাঁর সৌন্দর্যের তুলনা করে, পুরুষদের ক্ষেত্রে সেই কঠোরতা লক্ষ্য করা যায় না।

মালাইকা আক্ষেপ করে বলেন যে, বয়স নিয়ে কৌতূহল এবং প্রশ্নগুলো সব সময় নারীদের দিকেই ছুড়ে দেওয়া হয়। একজন সফল নারীকে খুব সহজেই প্রশ্ন করা হয়—তাঁর সোনালী সময় বা যৌবনকালের তুলনায় বর্তমান বয়সে তিনি নিজেকে কতটা আকর্ষণীয় মনে করেন। অথচ সমসাময়িক কোনো পুরুষ অভিনেতাকে এ ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে দেখা যায় না। মালাইকার মতে, এই মানসিকতা মূলত একধরণের সামাজিক বৈষম্য। তিনি মনে করেন, যদি বয়সের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতেই হয়, তবে নারী এবং পুরুষ উভয়কেই সমভাবে প্রশ্ন করা উচিত।


সৌন্দর্য বনাম মানসিক প্রশান্তি

কেবল বাহ্যিক অবয়ব বা ফিটনেস নয়, মালাইকার কাছে প্রকৃত সৌন্দর্যের সংজ্ঞা আরও গভীর। তিনি মনে করেন, পৃথিবী কেবল বাইরের চাকচিক্য দেখে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ মানসিক ও আবেগীয় স্বাস্থ্যই প্রকৃত চালিকাশক্তি। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সারা দিনের পরিকল্পনা এবং নিজের মনের ইচ্ছার ওপর গুরুত্ব দেওয়াকে তিনি বেশি জরুরি মনে করেন।

অভিনেত্রী জানান, তিনি কেবল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বাহ্যিক রূপ নিয়ে সময় ব্যয় করেন না। বরং তাঁর লক্ষ্য এমন কিছু করা যা তাঁকে নিজে এবং তাঁর পরিবারকে গর্বিত করবে। মালাইকার বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, একজন মানুষের ভাবনা এবং কর্মই তাঁর আসল পরিচয় নির্ধারণ করে। বাহ্যিক সৌন্দর্য সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু মানসিক দৃঢ়তা এবং অনুপ্রেরণামূলক কাজগুলো দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।


বলিউডে মালাইকার উত্তরাধিকার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য যে, মালাইকা অরোরা কেবল একজন নৃত্যশিল্পী বা অভিনেত্রী হিসেবেই নন, বরং একজন সফল উদ্যোক্তা এবং ফিটনেস আইকন হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। ৫২ বছর বয়সেও তাঁর এই সক্রিয়তা অনেক তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তবে এই সফলতার পাশাপাশি বয়স নিয়ে যে ক্রমাগত আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়, তাকে তিনি ‘এজ-শেমিন’ বা বয়স ভিত্তিক অবমাননা হিসেবে দেখেন।

বর্তমান বিনোদন শিল্পে যেখানে নারী তারকাদের একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর ‘অকেজো’ মনে করার প্রবণতা ছিল, সেখানে মালাইকা তাঁর কাজের মাধ্যমে সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, নারীদের জীবনের কোনো ‘সেরা সময়’ বা ‘প্রাইম টাইম’ বলে কিছু নেই; বরং সঠিক মানসিকতা থাকলে জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই সেরা হতে পারে। মালাইকার এই স্পষ্টভাষী বক্তব্য মূলত সমাজের সেই প্রচলিত কাঠামোর বিরুদ্ধে এক ধরণের প্রতিবাদ, যা নারীকে কেবল বয়স এবং শারীরিক সৌন্দর্যের মানদণ্ডে বিচার করে।

সামগ্রিকভাবে, মালাইকা অরোরা প্রমাণ করেছেন যে, সামাজিক প্রতিকূলতা এবং লিঙ্গ বৈষম্যের উর্ধ্বে উঠে নিজের ব্যক্তিত্ব ও মানসিক প্রশান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হলো জীবনের প্রকৃত সার্থকতা। তাঁর এই অবস্থান সমকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীর ক্ষমতায়ন এবং বয়স সংক্রান্ত ট্যাবু ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।