ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে ভিডিও রিলস তৈরি ও প্রকাশকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের জেরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে আশুগঞ্জ বাজারে আবিরপাড়া ও নাকরপাড়া গোষ্ঠীর লোকজনের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার ঘিরে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় বাজারের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত দুর্গাপুর ইউনিয়নের সোহাগপুর গ্রামে। ওই গ্রামের আবিরপাড়া গোষ্ঠীর সিয়াম ও ফাহাদ এবং নাকরপাড়া গোষ্ঠীর আরিফ ও বক্কর পরস্পরের বন্ধু। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও গত বৃহস্পতিবার টিকটকে ভিডিও রিলস নিয়ে চারজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি দুই পক্ষের অন্য লোকজনের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
এ নিয়ে শুক্রবার থেকেই উভয় গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বিরোধের অবসান ঘটাতে শনিবার দুপুরে আশুগঞ্জ বাজারে স্থানীয়ভাবে সালিশের আয়োজন করা হয়। সেখানে দুই পক্ষের উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে বলে মনে হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, সালিশের পর দুই পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। শুরুতে কথাকাটাকাটি হলেও পরে তা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে রূপ নেয়। সংঘর্ষের কারণে আশুগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন স্থানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ ক্রেতা, পথচারী ও ব্যবসায়ীরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটাছুটি করেন। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে অনেক ব্যবসায়ী দ্রুত তাঁদের দোকানের শাটার নামিয়ে দেন। এতে ব্যস্ত বাজারের স্বাভাবিক বেচাকেনা সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়।
সংঘর্ষে দুই পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁরা চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে আহতদের মধ্যে কারও অবস্থা গুরুতর কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে সংঘর্ষে ঠিক কতজন কী ধরনের আঘাত পেয়েছেন, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
খবর পেয়ে আশুগঞ্জ থানা-পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। স্থানীয় বাসিন্দারাও সংঘর্ষ থামাতে এগিয়ে আসেন। পুলিশ ও স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একপর্যায়ে দুই পক্ষের লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে বাজারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আশুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনিসুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, টিকটক ভিডিও রিলসকে কেন্দ্র করে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে সংঘর্ষ থামিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
ওসি আরও জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তবে বিষয়টি পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরি বা প্রকাশকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে সংঘবদ্ধ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার এ ঘটনা স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে একটি ব্যক্তিগত বিষয় মীমাংসার জন্য আয়োজিত সালিশের পরও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংযম বজায় রাখা এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।
এদিকে, পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও সংঘর্ষের ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। তবে বিরোধের প্রকৃত কারণ, সংঘর্ষে কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন এবং এ ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হবে কি না, তা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হতে পারে।


