দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এই রোগে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫১২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৩৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০২ জন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ১২ হাজার ১১১ জন।
এই হিসাব বলছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানুষের বড় একটি অংশ চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে নতুন রোগী ভর্তি এবং মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।
ঢাকার বাইরে রোগী বেশি কয়েকটি বিভাগে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও মহানগর এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ ২৯৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরের জেলাগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ২৫০ জন। বরিশাল বিভাগে ২৩১ জন এবং খুলনা বিভাগে ২০৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ১৬২ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৪৬ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬০, রংপুর বিভাগে ৪৪ এবং সিলেট বিভাগে ৮ জন।
অঞ্চলভিত্তিক ভর্তি রোগীর সংখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো—
-
চট্টগ্রাম বিভাগ: ২৯৪ জন
-
ঢাকা বিভাগ (সিটি করপোরেশনের বাইরে): ২৫০ জন
-
বরিশাল বিভাগ: ২৩১ জন
-
খুলনা বিভাগ: ২০৬ জন
-
রাজশাহী বিভাগ: ১৬২ জন
-
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন: ১৪৬ জন
-
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন: ১১১ জন
-
ময়মনসিংহ বিভাগ: ৬০ জন
-
রংপুর বিভাগ: ৪৪ জন
-
সিলেট বিভাগ: ৮ জন
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গু সংক্রমণ শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। দেশের বিভিন্ন বিভাগেই নতুন রোগী শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকা, বরিশাল ও খুলনায় রোগী ভর্তির সংখ্যা বেশি থাকায় এসব অঞ্চলে মশা নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসাসেবা প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তবে হাসপাতালভিত্তিক ভর্তি রোগীর সংখ্যা দিয়ে কোনো এলাকার মোট সংক্রমণের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। যাঁরা আক্রান্ত হয়েও হাসপাতালে ভর্তি হননি, তাঁদের সংখ্যা এই হিসাবের বাইরে থাকতে পারে।
আগের বছরগুলোর তুলনায় ডেঙ্গুর চিত্র
বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরেই ডেঙ্গু জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগ হিসেবে রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ১ হাজার ৭০৫ জন।
পরবর্তী দুই বছরে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি।
২০২৪ সালে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। ওই বছর মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জনে, আর মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের।
চলতি বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আগের দুই বছরের পূর্ণ বছরের হিসাব ছাড়িয়ে গেছে। তবে বছর শেষ হতে এখনো সময় বাকি থাকায় ২০২৬ সালের চূড়ান্ত পরিস্থিতি বুঝতে পরবর্তী সময়ের তথ্যও বিবেচনা করতে হবে।
বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান:
| বছর | হাসপাতালে ভর্তি রোগী | মোট মৃত্যু |
|---|---|---|
| ২০২৩ | ৩,২১,১৭৯ | ১,৭০৫ |
| ২০২৪ | ১,০১,২১৪ | ৫৭৫ |
| ২০২৫ | ১,০২,৮৬১ | ৪১৩ |
| ২০২৬ (২২ অক্টোবর পর্যন্ত) | ১,১৮,৫০২ | ৩৬৮ |
উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত পরিসংখ্যান; ২০২৬ সালের হিসাব ২২ অক্টোবর পর্যন্ত।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সতর্কতা জরুরি
ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এ মশা বংশবিস্তার করে। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, পানির ট্যাংক, ডাবের খোসা, পুরোনো টায়ার কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ও নির্মাণস্থলেও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। জমে থাকা পানি অপসারণ এবং পানির পাত্র ঢেকে রাখার মতো সাধারণ পদক্ষেপও মশার বংশবিস্তার কমাতে সহায়তা করে।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমিভাব এবং ত্বকে ফুসকুড়ি। তবে কিছু ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে।
তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্থিরতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের পরীক্ষা করানো উচিত। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনজাতীয় ওষুধ সেবন করা উচিত নয়, কারণ এসব ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ৩৬৮ জনের মৃত্যু এবং ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য রোগটির ঝুঁকির বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মশা নিধন, প্রজননস্থল ধ্বংস, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জ্বরকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াই জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমানোর অন্যতম উপায়।


