ঢাকার নিম্ন আদালতে নথি চুরি ও ভুয়া রায় চক্রের ছক ফাঁস

রাজধানীর বিচারপাড়ায় জালিয়াতির এক অভাবনীয় ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালতের এজলাস থেকে দু-দুটো সংবেদনশীল মামলার মূল নথি চুরির পর অনুসন্ধানে নেমে এক ভয়াবহ জালিয়াতি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দেওয়া আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেল নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে এই চক্রটি পরিচালিত হতো। আদালত ভবনের বাইরের কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে বসেই নিখুঁতভাবে তৈরি করা হতো বিচারকের ভুয়া রায়, খালাস আদেশ ও সিলমোহর।
ঘটনার সূত্রপাত খিলগাঁও থানার একটি পুরনো অস্ত্র মামলা ও ভাটারা থানার একটি মাদক মামলাকে কেন্দ্র করে। অস্ত্র মামলার মূল আসামি তানভীর আহমেদ তনয় ওরফে রাব্বী গত চার-পাঁচ বছর ধরে সৌদি আরবে পলাতক। অন্যদিকে তাঁর মামা রবিউল হক মাদক মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে আছেন। আদালতে যাতায়াতের সুবাদে তানভীরের স্ত্রী জামিলা আক্তার ওরফে অর্পার সঙ্গে পরিচয় হয় আনোয়ারুলের। নিজেকে আইনজীবীর সহকারী দাবি করে ওই দুই পলাতক আসামিকে মামলা থেকে পুরোপুরি খালাস পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। বিনিময়ে জামিলার কাছ থেকে নেওয়া হয় ৯০ হাজার টাকা।
টাকা নেওয়ার পর প্রথমে একটি কম্পিউটারে টাইপ করা ভুয়া খালাসের আদেশ তৈরি করে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পর আদালত থেকে আসামির নামে পুনরায় সমন জারি হলে জামিলার মনে সন্দেহ জাগে। জালিয়াতি ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে আনোয়ারুল এক দুঃসাহসিক ও চরম বিপজ্জনক পথ বেছে নেন—আদালতের এজলাস থেকেই মূল নথি গায়েব করার পরিকল্পনা করেন তিনি।
গত ২ জুলাই দুপুরে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাসে ঢুকে অস্ত্র মামলার নথিটি দেখতে চান আনোয়ারুল। আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান তাঁকে ফাইলটি দেখতে দিয়ে বিচারকের ডাকে পাশের খাসকামরায় যান। মাত্র পাঁচ মিনিট পর ফিরে এসে দেখেন আনোয়ারুলও নেই, নথিটিও উধাও। এ ঘটনায় বেঞ্চ সহকারী খায়রুল আলম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর একই কায়দায় ৩ আগস্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালত থেকে রবিউল হকের মাদক মামলার নথিটিও চুরি করে চম্পট দেন তিনি।
পরপর দুটি চুরির ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গত ২১ আগস্ট শ্যামপুরের একতা হাউজিং এলাকা থেকে পুলিশ আনোয়ারুলকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তে জানা যায়, আনোয়ারুল আইনজীবী আবদুস সাত্তারের চেম্বারের পিয়ন হিসেবে কাজ করতেন। সেখান থেকে মক্কেলদের ফোন নম্বর চুরি করে পালিয়ে গিয়ে তিনি এই প্রতারণা শুরু করেন।
আনোয়ারুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে আদালতপাড়ার কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীব ও আসামি তানভীরের স্ত্রী জামিলাকে গ্রেপ্তার করা হয়। হাবীবের কম্পিউটারের ফোল্ডার থেকে অন্তত ১০টি মামলার ভুয়া রায় ও আদেশের কপি উদ্ধার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত জামিলা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে জানিয়েছেন, আনোয়ারুলই মূল ফাইল চুরি করে এনে তাঁর কাছে রেখেছিলেন এবং বলেছিলেন সেটিই খালাসের আইনি কাগজ।
বর্তমানে আনোয়ারুল ও কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীব রিমান্ডে রয়েছেন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জানান, এজলাস থেকে নথি চুরি ও ভুয়া রায় তৈরি করা বিচারব্যবস্থার ওপর এক মারাত্মক আঘাত। তদন্তে কোনো আইনজীবীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাঁর বার কাউন্সিলের সনদ বাতিলের আশ্বাস দেন তিনি। অপরাধচক্রের বাকিদের গ্রেপ্তার ও ভুয়া সিল উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।
Tags :

Shakib

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।