জ্বালানিসংকট ও কার্বন কমানোর চাপে সৌরবিদ্যুতে ঝুঁকছে বড় শিল্পগোষ্ঠী

জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমানো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবেশগত শর্ত পূরণে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলো দ্রুতগতির সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। দেশে বিদ্যুতের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি ও গ্যাসসংকটের দরুন তিন বছর ধরে এ খাতে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস’ (আইইইএফএ)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৩৯টি বড় শিল্পকারখানার ছাদে বসানো সৌরবিদ্যুতের প্রকৃত সক্ষমতা ইতিমধ্যে ৬৬ড় মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। ছোট-বড় সব স্থাপনা হিসাব করলে এই সক্ষমতা হাজার মেগাওয়াট ছুঁতে পারে।
শিল্প উদ্যোক্তারা জানান, গ্রিডের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম যেখানে ১২ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে প্রায় ১৬ টাকা পর্যন্ত পড়ে, সেখানে ছাদের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে মাত্র ৪ থেকে ৮ টাকা। খরচ অর্ধেকের চেয়ে কম হওয়ায় এবং প্ল্যান্টগুলোর আয়ুষ্কাল ২০-২৫ বছর হওয়ায় এই বিনিয়োগ দ্রুত উঠে আসে। আবুল খায়ের স্টিল, ওয়ালটন, হা-মীম, প্রাণ-আরএফএল, আকিজ বশির, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই), বিএসআরএম, ইয়ংওয়ান, ডিবিএল ও রাইজিং গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের কারখানায় ব্যাপক হারে সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর উৎপাদন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
শিল্পগোষ্ঠীর নাম বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
ডিবিএল গ্রুপ ৫.৫ মেগাওয়াট (৭টি কারখানায়) নতুন ১০টি কারখানায় আরও ১৬ মেগাওয়াট (চলতি বছর ৮ মেগাওয়াট)
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ৩৫ মেগাওয়াট (২০টি কারখানায়) মোট ১০০ মেগাওয়াটের বেশি; এ বছর আরও ৩০ মেগাওয়াট যুক্ত হবে
আকিজ বশির গ্রুপ ৭৫ মেগাওয়াট আরও ২৮ মেগাওয়াট সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলমান
মেঘনা গ্রুপ (এমজিআই) ৬৪.৮৪ মেগাওয়াট নতুন ৫০ মেগাওয়াট যুক্ত করে মোট ১১৫ মেগাওয়াটে উন্নীত করা
ওমেরা সোলার (ইস্ট কোস্ট) ১৩০-১৪০ মেগাওয়াট (১০০ কারখানায়) চলমান প্রজেক্টে আরও ২০ মেগাওয়াট যুক্ত হচ্ছে
রাইজিং গ্রুপ ১৪ মেগাওয়াট (৬টি কারখানায়) চাহিদার ক্ষেত্রভেদে ১৫% থেকে ৬০% সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ
সুপারস্টার রিনিউবেল ১০০ মেগাওয়াট (৯০টি কারখানায়) আরও ১০টির বেশি কারখানায় ২০ মেগাওয়াট স্থাপনের কাজ চলছে
ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম জানান, তাঁদের কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ পড়ছে ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা। ওমেরা সোলারের সিইও মাসুদুর রহমান ও রাইজিং গ্রুপের এমডি মাহমুদ হাসান খানও নিশ্চিত করেন যে গ্রিডের চেয়ে খরচ অর্ধেকের কাছাকাছি হওয়ায় ব্যবসায়িক দিক থেকেই উদ্যোগটি লাভজনক। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রেতাদের দেওয়া ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর শর্তের কারণে পোশাক খাতের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়ে উঠছে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট। বিজিএমইএ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর তথ্যানুযায়ী, শুধু পোশাক খাতেই প্রায় ১,৭৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মাঝারি আকারের কারখানাগুলোর জন্য শুরুতে বিশাল অংকের তহবিল জোগাড় করা কঠিন। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইডকলের মাধ্যমে কম সুদে ঋণ সরবরাহ ও ব্যাংক গ্যারান্টি সহজ করা হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও এই প্রযুক্তির বিস্তার দ্রুত গতি পাবে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্যে চলতি বাজেটে সৌরবিদ্যুতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা উৎপাদন খরচ আরও ১৫ শতাংশ কমাতে পারে বলে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন।
Tags :

Shakib

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।