কনকাশনে ক্যারিয়ার শেষ, এবার সাবেক স্কুলের বিরুদ্ধে পুকোভস্কি

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক টেস্ট ব্যাটসম্যান উইল পুকোভস্কি মাত্র ২৬ বছর বয়সে পেশাদার ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বারবার মাথায় আঘাতজনিত কনকাশনের শিকার হওয়াই শেষ পর্যন্ত তাঁর ক্রিকেটজীবনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এবার সেই দীর্ঘ সমস্যার সূত্রপাত যে ঘটনায়, সেটি নিয়ে নিজের সাবেক স্কুলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি।

মেলবোর্নের উপশহরে অবস্থিত ব্রাইটন গ্রামার স্কুলের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন পুকোভস্কি। ২০১৪ সালে ওই স্কুলে পড়ার সময় ফুটবল অনুশীলনে প্রথম গুরুতর কনকাশনের শিকার হন তিনি। অনুশীলনের একপর্যায়ে দুর্ঘটনাবশত এক সতীর্থের হাঁটু তাঁর মাথায় আঘাত করে। আঘাতের পর তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পুকোভস্কির অভিযোগ, ওই ঘটনার পর তাঁকে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার পরিবর্তে আবারও অনুশীলনে ফিরতে হয়েছিল।

বছরের শুরুতে এক অনুষ্ঠানে নিজের সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পুকোভস্কি জানিয়েছিলেন, মাঠের বাইরে নেওয়ার পর তাঁর স্মৃতিতে পরবর্তী যে বিষয়টি রয়েছে, তা হলো কোচের একটি প্রশ্ন—তিনি আবার অনুশীলন চালিয়ে যেতে চান কি না। সম্মতি দেওয়ার পর তিনি সেদিনের অনুশীলন চালিয়ে যান। পুকোভস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি তাঁর জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। এর পর থেকে তিনি আর আগের মতো স্বাভাবিক অনুভব করতেন না এবং দীর্ঘ সময় দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকেও দূরে থাকতে হয়েছে।

প্রথম ঘটনার পর পুকোভস্কি আরও ১২ বার কনকাশনের শিকার হন। অর্থাৎ তাঁর ক্যারিয়ারে মোট ১৩টি কনকাশনের ঘটনা ঘটে। এত অল্প বয়সে বারবার মাথায় আঘাত পাওয়ার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত তাঁর ক্রিকেটজীবনের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে।

কনকাশন হলো মাথায় আঘাতের ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সাময়িক ব্যাঘাত। খেলাধুলায় এ ধরনের আঘাতের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ, মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং পর্যাপ্ত পুনর্বাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণ খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও জরুরি। কারণ, বিকাশমান মস্তিষ্কে আঘাতের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং বারবার আঘাত পেলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

পুকোভস্কি পরে ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং ২০২১ সালে ভারতের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে একটি টেস্ট ম্যাচ খেলেন। তবে কনকাশন ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর ক্যারিয়ারে বারবার ছেদ পড়ে। ২০১৮ সালে মানসিক স্বাস্থ্যের কারণেও তাঁকে ক্রিকেট থেকে বিরতি নিতে হয়েছিল।

২০২৪ সালের মার্চে শেফিল্ড শিল্ডের একটি ম্যাচে রাইলি মেরিডিথের বলে মাথায় আঘাত পান পুকোভস্কি। সেটিই তাঁর শেষ বড় কনকাশন হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন একটি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শের ভিত্তিতে তিনি পেশাদার ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

অবসরের পর নিজের শারীরিক দুরবস্থার কথাও জানিয়েছিলেন পুকোভস্কি। সর্বশেষ কনকাশনের পর কয়েক মাস তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেননি। এমনকি বাড়ির ভেতর হাঁটাচলাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। অতিরিক্ত ঘুম, দৈনন্দিন কাজে অক্ষমতা এবং পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতার অভিজ্ঞতাও তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে।

পুকোভস্কির ক্যারিয়ারের প্রথম কনকাশনের পর এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে ক্রিকেটে মাথায় আঘাতের বিষয়টি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কনকাশন বদলি খেলোয়াড়ের নিয়ম চালু করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল। একই বছরের অ্যাশেজ সিরিজে স্টিভ স্মিথ মাথায় আঘাত পাওয়ার পর মারনাস লাবুশেন টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম কনকাশন বদলি হিসেবে মাঠে নামেন।

ফলে পুকোভস্কির মামলা শুধু একজন সাবেক ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত আইনি লড়াই নয়; এটি তরুণ খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা, মাঠে মাথায় আঘাতের পর যথাযথ চিকিৎসা এবং খেলায় ফেরানোর প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে। এক দশক আগের একটি আঘাত কীভাবে একজন প্রতিভাবান ক্রিকেটারের জীবন ও ক্যারিয়ারে দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে, পুকোভস্কির অভিজ্ঞতা তারই একটি গুরুতর উদাহরণ।

Tags :

Shakib

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।