খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
কিংবদন্তি সংগীত পরিচালক এ আর রহমান সম্প্রতি হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্পে তাঁর কাজের পরিধি কমে যাওয়া নিয়ে যে আলোচনার সূত্রপাত করেছিলেন, তার প্রেক্ষিতে মুখ খুলেছেন প্রখ্যাত গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতার। রহমান তাঁর কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার পেছনে মুম্বাইয়ের পরিবর্তিত ক্ষমতা কাঠামো এবং পরোক্ষভাবে ‘সাম্প্রদায়িক অনুষঙ্গ’ থাকার যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, জাভেদ আখতার তা স্পষ্টভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর মতে, রহমানের মতো উঁচু মাপের শিল্পীর ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান এই ইন্ডাস্ট্রিতে নেই।
বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ আর রহমান জানিয়েছিলেন, হিন্দি সিনেমায় আগের মতো তাঁকে এখন আর দেখা যায় না। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান যে, বর্তমানে সৃজনশীলতাহীন মানুষের হাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা চলে গেছে। তিনি একে ‘চাইনিজ হুইস্পার্স’ বা পরোক্ষ কানাঘুষার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, অনেক সময় শোনা যায় তাঁকে কোনো কাজের জন্য চূড়ান্ত করা হলেও শেষ মুহূর্তে মিউজিক কোম্পানি অন্য পাঁচজন সংগীত পরিচালককে নিয়োগ দেয়। রহমান ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এর পেছনে হয়তো কোনো সাম্প্রদায়িক কারণ থাকতে পারে, যদিও সরাসরি তাঁর সামনে এমন কিছু কখনো ঘটেনি।
জাভেদ আখতার বার্তা সংস্থা আইএএনএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি দীর্ঘকাল ধরে কাজ করছেন এবং কখনো এমন কোনো সাম্প্রদায়িক বিভাজন অনুভব করেননি। তাঁর মতে, রহমানের কাজের পরিধি কমার পেছনে তাঁর আকাশচুম্বী মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক ব্যস্ততাই মূল কারণ হতে পারে।
জাভেদ আখতারের দেওয়া প্রধান যুক্তিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ |
| আন্তর্জাতিক ব্যস্ততা | রহমানের বিশাল সব শো এবং পশ্চিমা দেশগুলোতে তাঁর ঘনঘন সফর দেখে অনেকে ধরে নেন তিনি হয়তো হিন্দি সিনেমার জন্য সময় দিতে পারবেন না। |
| উঁচু মর্যাদা (Stature) | রহমানের উচ্চতা এখন এতটাই বেশি যে, অনেক মাঝারি বা ছোট প্রযোজক সরাসরি তাঁর কাছে যাওয়ার সাহস পান না। |
| সাম্প্রদায়িকতার অভাব | জাভেদ আখতারের মতে, মুম্বাইয়ের সবাই রহমানকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে এবং এখানে সাম্প্রদায়িক কোনো উপাদান নেই। |
| প্রাপ্যতা (Availability) | অনেকে মনে করেন রহমান সাধারণ প্রোজেক্টের জন্য সহজলভ্য নন, যদিও জাভেদ বিশ্বাস করেন যোগাযোগ করলে তিনি অবশ্যই সাড়া দেবেন। |
জাভেদ আখতার মনে করেন, রহমানের মতো অস্কারজয়ী একজন শিল্পীর কাছে প্রযোজকরা যেতে ভয় পান কারণ তাঁরা ভাবেন রহমানের পারিশ্রমিক বা সময়ের সাথে তাঁরা তাল মেলাতে পারবেন না। তিনি বলেন, “রহমান অনেক বড় মানুষ। একজন ছোট প্রযোজক তাঁর কাছে যেতে ভয় পান। কিন্তু আমি মনে করি না এর মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িক বিষয় আছে। আপনি কেন তাঁর কাছে যান না? যোগাযোগ করলে তিনি নিশ্চয়ই আসবেন।”
অন্যদিকে, রহমানের আক্ষেপ ছিল মূলত সেই সব ব্যক্তিদের প্রতি যারা সংগীতের সৃজনশীলতার চেয়ে ব্যবসায়িক লাভক্ষতি বা ক্ষমতা প্রদর্শনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। রহমান কৌতুকচ্ছলে এও বলেছিলেন যে, যদি কেউ তাঁকে না নেয়, তবে তিনি সেই সময়টুকু পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে আনন্দ পান। তবে পরোক্ষভাবে কাজ হাতছাড়া হওয়ার বিষয়টি যে তাঁকে পীড়া দেয়, তা তাঁর কথায় স্পষ্ট ছিল।
হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের এই দুই মহীরুহের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বলিউডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং মানসিকতাকে নতুন করে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে। যেখানে রহমান এক অদৃশ্য দেয়াল বা সাম্প্রদায়িক ছায়ার উপস্থিতি অনুভব করছেন, সেখানে জাভেদ আখতার সেই ধারণাকে স্রেফ অমূলক ভয় বা ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে দেখছেন। তবে এই বিতর্কের উর্ধ্বে সত্য হলো—এ আর রহমানের সুরের মূর্ছনা আজও বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে অমলিন।