কিশোর হত্যার জেরে সীতাকুণ্ডে অভিযুক্ত যুবককে পিটিয়ে হত্যা
খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও কুপিয়ে হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নাঈম নামের ওই কিশোরের মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী অভিযুক্ত নুরুল ইসলাম ইরানকে (৪৫) খুঁজে বের করে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে বলে জানা গেছে। পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন ইরানের বাড়িঘর ও তার নিয়ন্ত্রণে থাকা বলে অভিযোগ ওঠা কয়েকটি আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
শনিবার (২৫ জুলাই) রাতে সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাটেরখীল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত কিশোর নাঈম স্থানীয় একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অপরদিকে, নিহত ইরান ওই এলাকার নুরুল হকের ছেলে।
স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের বক্তব্য অনুযায়ী, নুরুল ইসলাম ইরানের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি তার এক সহযোগীর কিছু ইয়াবা হারিয়ে যায়। পরে ওই সহযোগী ইয়াবাগুলো নাঈম ও ২০ বছর বয়সী এমরানের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন। এই অভিযোগের পর গত সোমবার (২০ জুলাই) রাতে ইরান কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে নাঈম ও এমরানকে তাদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্বজনদের অভিযোগ, সেখানে দুই তরুণকে ব্যাপক মারধর করা হয়। একপর্যায়ে নাঈমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্যাতন করা হয় এবং তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করা হয়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে বাড়ির সামনে ফেলে রেখে যাওয়া হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে এমরানকেও মারধর করা হচ্ছিল। তার পরিবারের সদস্যরা ইরানের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলে তিনি টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ। পরে ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার পর এমরানকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর নাঈম ও এমরান দুজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে নাঈমের মৃত্যু হয়। এমরান বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
নাঈমের চাচা মো. ফারুক বলেন, তাঁর ভাতিজা অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও স্বভাব-চরিত্রে ভালো ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ইরানের হারিয়ে যাওয়া ইয়াবার দায় নাঈম ও এমরানের ওপর চাপানো হয়েছিল। এরপর তাদের তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। নাঈমকে গুরুতর আহত অবস্থায় বাড়ির সামনে ফেলে রাখা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে নাঈমের জানাজাকে কেন্দ্র করে শনিবার বিকেলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিকেল ৫টার দিকে জানাজার সময় মাইকে ঘোষণা দিয়ে নাঈমের ওপর চালানো নির্যাতনের প্রতিবাদ জানানো হয়। এর কিছুক্ষণ পর ইরান কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পরে মাইকিং করে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকজনকে একত্রিত করা হয়। একপর্যায়ে চার গ্রামের মানুষ ইরানকে খুঁজে বের করে হামলা চালায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। হামলায় ইরান নিহত হন। এরপর উত্তেজিত জনতা তাঁর বাড়িঘরে আগুন দেয় এবং ইরানের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো—এমন অভিযোগে ১০ থেকে ১২টি ঘর ভাঙচুর করে গুঁড়িয়ে দেয়।
ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। একদিকে কিশোর নাঈমকে হত্যার অভিযোগে বিচার দাবি উঠেছে, অন্যদিকে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনাও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই ঘটনায় প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের অভিযোগ থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, নাঈম হত্যার ঘটনায় শনিবার থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। পরে নাঈমের জানাজা শেষে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযুক্ত ইরানকে হত্যা করে এবং তাঁর বাড়িতে আগুন দেয়। পাশাপাশি ইরানের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো—এমন ১০ থেকে ১২টি ঘর ভেঙে ফেলার কথাও জানান তিনি।
নাঈমের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার তদন্তের পাশাপাশি ইরানকে হত্যার ঘটনা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের বিষয়েও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে এসব ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। Aদিকে, নাঈম ও এমরানের ওপর নির্যাতনের অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন নিহত কিশোরের স্বজন ও স্থানীয়রা।