ঢাকার যাত্রী !

একক পরিবারের চৌকাঠ পেড়িয়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে না ব্যস্ত ঢাকার নাগরিক জীবন। তাই এখানে চন্দ্র সূর্যের দেখা মিলে না। বিষাক্ত কলিগদের বিষক্রিয়া, অতঃপর জনজট-যানজটে ঘর্মাক্ত ক্লান্ত শ্রান্ত শরিরটাকে টেনে নিয়ে কোনরকমে ফ্ল্যাটে পৌছে গেলেই, কেমন অমৃত অমৃত একটা ভাব চলে আসে। বৌয়ের ঘেনর-ঘেনর আর বাচ্চাদের অত্যাচার সেই অমৃতে আচার-চাটনির স্বাদ জোগায় বৈ কি! তাই ঢাকার সামাজিক বৃত্ত বলতে, সেই পুত্র-জায়া-কণ্যা। প্রতিবেশী কে বা কারা? চিনি না তো! তাই এখানে প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কটা  অনেক মধুর! কোন কলহ নেই! একে বারেই নির্ঝঞ্জাট জীবন! সমাজের সাতে পাঁচে কাউকেই থাকতে হয় না। যদিও এরূপ মওকায় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ কিংবা ঠকবাজ রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় ঢাকার রাজনীতি।

তবে কি শহুরে জীবনই ভাল??

ভাল বৈ কি? না হলে গ্রাম গুলো কেন লাফিয়ে লাফিয়ে শহর হতে চাইছে? কেন ঢাকার মতো অপরিকল্পিত, অপরিচ্ছন্ন, মায়া মমতাহীন, সামাজিকতাহীন নগর হতে চাইছে জসিম উদ্দিনের মায়া মমতায় জড়িয়ে থাকা আমাদের গ্রাম গুলো?

তবে কি আমরা অসামাজিক হতে পছন্দ করছি? নতুবা কেন কুকুর দৌড়ে এগিয়ে চলেছে মধুমাখা ছায়াঢাকা আমার সোনার গ্রাম গুলো, পঁচা শহুরে রূপান্তর হতে?

বিবর্তন। আমরা এক ভিন্ন মাত্রায় বিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। গ্রামে আসলে আপনিও এই সামাজিক বিবর্তনের স্বাক্ষী হতে পারবেন। দেখবেন কিভাবে অস্থিরতা গ্রামের সরল মানুষটিকে কুটিল ও জটিল করে তুলছে। কিভাবে তাঁরা অপরিকল্পিত ভাবে কৃষি জমি ও জলাশয় ভরাট করে খুপরি খুপরি একতলা দু’তলায় ভরে তুলছে তাদের গ্রাম। কেন জনে জনে আলাদা বাড়ি, আলাদা বিল্ডিং? সহজ উত্তর, এতে স্ট্যাটাস বাড়ে। তবে এই উন্নয়নে রাস্তার কোন প্রয়োজন নেই! তিনফুট চওড়া হলেই তো একটি রিকশা বাড়িতে ঢোকবে, তো খামাখা কেন এত অপচয়? হক কথা। তবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা? উত্তর মেলে, দশ লক্ষ টাকা শতাংশ জমি কি ড্রেনের জন্য ছেড়ে দেব? মন্দ বলেননি।

যদি প্রশ্ন করি, কিসের জন্য এক শতক, দুই শতক জায়গায় বিল্ডিং এর নাম জঞ্জাল তৈরি করছেন? দুই তিন ভাই মিলে একটি উচু বিল্ডিং করলেই তো রাস্তা-ঘাট ও  অন্যান্য নাগরিক সুবিধা, গাড়ি চলাচলের রাস্তা সবই থাকতো!

উত্তর পাওয়া যায়, ওদের (ভাইয়ের) মুখ দেখলেই গা গ্যান গ্যান করে। ঢাকায়তো দশ জেলার দশ জন মিলে দশ তলা করে ভাগাভাগি করে? আর ভাই ভাই? 
সেটাই ভাল। অর্থাৎ গ্রামের মানুষও প্রতিবেশীহীন সেই নেই সমাজের বাসিন্দা হতে আজ মরিয়া।

কেন?

উত্তর, অস্থিরতা। অপরকে দেখে তারা ক্ষুধা কাতর, পরশ্রী কাতর। কিসের জন্য অস্থির, কেন এবং কিভাবে তারা এত টকসিক হয়ে উঠলো, এসবের যুতসই বিশ্লেষণ আরেকদিন করা যাবে। শুধু এটুকু বলি, গ্রামের মানুষ অধিকাংশই আজ সুখে নেই, শান্তিতে নেই, খুশি নেই। তাদের মেজাজ অত্যন্ত চড়া, বংশানুক্রম পেশি শক্তিতে এখনও আস্থাশীল। কৃষি কাজ অপছন্দ করে একটি অটো রিকশা অথবা একটি সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহে এখন গ্রাম্য যুবক বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। ফলে গ্রামের পাশের গঞ্জে মানুষ আরামে দশ টাকায় যেতে পারে বটে, কিন্তু ঘিঞ্জি রাস্তায় হাজার হাজার অটো রিকশার জটলা যেমন মানুষের স্বাভাবিক হাটা চলাকে থামিয়ে দিচ্ছে। বোনাস হিসাবে রিকশার পে পু’ শব্দে কানের ত্রাহী ত্রাহী অবস্থা। এসব মিলে মানুষ এতো অধৈর্য্য, জনজীবন এতো অস্থির। ডায়াবেটিক ও হার্টের রোগে ভরে যাচ্ছে গ্রাম গুলো। মানুষ আরও টকসিক, আরও বিষাক্ত, আরও পরশ্রী কাতর হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। সেই সাথে মাদকের তীব্র বিস্তার যুব সমাজকে ধ্বংস করে একটি মেরুদন্ডহীন দুর্বল মানুষ কিংবা নোংরা রাজনীতির চামচায় পরিনত করছে। এই ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের হাত থেকে বাঁচতেই কি আমাদের কোমল গ্রামগুলো এখন ভাবলেশহীন অপরিকল্পিত ঢাকা হতে চাচ্ছে??

লেখক: জি এম কিবরিয়া, গ্রিন এন্ড ক্লিন ফাউন্ডেশন ও গরিব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।