বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে সোমবার বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। শহরটির এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) স্কোর ১৭৯, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়। ধুলো, ধোঁয়া ও ক্ষতিকর বস্তুকণার উপস্থিতি নগরবাসীর জন্য বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের সূচকে এ তথ্য উঠে আসে। ওই তালিকায় ২৭০ একিউআই স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। শহরটির বাতাস ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর। শহরটির একিউআই স্কোর ১৭০। ভারতের কলকাতা ১৬৬ স্কোর নিয়ে চতুর্থ এবং ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা ১৫৮ স্কোর নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।
আইকিউএয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, একিউআই স্কোর শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে বাতাসের মান ‘ভালো’ হিসেবে বিবেচিত হয়। ৫১ থেকে ১০০ পর্যন্ত স্কোরকে ‘মাঝারি বা সহনীয়’ ধরা হয়। ১০১ থেকে ১৫০ হলে তা ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
এর পরের ধাপ ১৫১ থেকে ২০০, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত। ২০১ থেকে ৩০০ পর্যন্ত স্কোর হলে বাতাস ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১-এর বেশি হলে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে ঢাকার ১৭৯ স্কোর শহরটির বায়ুমানের গুরুতর অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশে বায়ুর মান নির্ধারণে একাধিক দূষণকারী উপাদানের মাত্রা বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বস্তুকণা বা পার্টিকুলেট ম্যাটার—পিএম১০ ও পিএম২.৫—এবং নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (এনও২), কার্বন মনোক্সাইড (সিও), সালফার ডাই-অক্সাইড (এসও২) ও ওজোন (ও৩)।
বিশেষ করে পিএম২.৫-এর মতো সূক্ষ্ম বস্তুকণা স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ। বাতাসে থাকা এসব ক্ষুদ্র কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে দীর্ঘ সময় বাইরে অবস্থান করা মানুষের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ে।
ঢাকার বায়ুদূষণের পেছনে রয়েছে একাধিক উৎস। ২০১৯ সালের মার্চে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে রাজধানীর বায়ুদূষণের তিনটি প্রধান উৎস হিসেবে ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া এবং নির্মাণকাজের ধুলাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলমান নির্মাণকাজ ও সড়কের ধুলা বাতাসে বস্তুকণার পরিমাণ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে যানবাহনের ধোঁয়া নগরীর বায়ুদূষণের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। এসব উৎস থেকে নির্গত দূষণকারী উপাদান একত্র হয়ে নগরবাসীর জন্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
বায়ুদূষণের প্রভাব শুধু চোখে জ্বালা, কাশি বা শ্বাসকষ্টের মতো তাৎক্ষণিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণের সঙ্গে স্ট্রোক, হৃদ্রোগ, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), ফুসফুসের ক্যান্সার এবং তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।
ডব্লিউএইচওর হিসাবে, বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকেই শ্বাসযন্ত্র বা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় ভোগা মানুষের ক্ষেত্রে দূষিত বাতাসের ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
ঢাকার বর্তমান একিউআই স্কোর তাই নগরীর বায়ুমান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। দূষণের প্রধান উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজে ধুলা কমানো, যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত বায়ুমান পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব। তবে এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।


