নতুন প্রজন্ম জানুক-বিএনপির সাবেক প্রধানমন্ত্রী-কে এই শাহ আজিজুর রহমান?

ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের গল্প নয়; ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক রাজনৈতিক চরিত্রও থাকে, যাদের জীবন ও ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আছে, প্রশ্ন আছে, আছে তীব্র মতপার্থক্য। সেই ইতিহাস জানা জরুরি—কারণ একটি জাতির রাজনৈতিক পথচলা বুঝতে হলে তার আলো যেমন জানতে হয়, তেমনি অন্ধকার অধ্যায়গুলোর দিকেও তাকাতে হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতির তেমনই এক বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত চরিত্র শাহ আজিজুর রহমান—যিনি একদিকে ছিলেন দক্ষ পার্লামেন্টেরিয়ান, সুবক্তা ও বহু ভাষায় পারদর্শী রাজনীতিক; অন্যদিকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর নাম গভীর বিতর্কের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

জন্ম ও রাজনৈতিক হাতেখড়ি

শাহ আজিজুর রহমানের জন্ম ২৩ নভেম্বর ১৯২৫ সালে কুষ্টিয়ায়। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন। অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে থেকেই তিনি রাজনীতি করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবির প্রশ্নে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করেন।

১৯৭১—ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শাহ আজিজুর রহমান স্বাধীনতার আন্দোলনের বিরোধিতা করে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেন। পাকিস্তানি রাষ্ট্রের পক্ষে তাঁর এই অবস্থান তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিতর্কিত রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত করে।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে তিনি পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে জাতিসংঘে যান। সেখানে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। একই সঙ্গে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার আহ্বান জানান।

এখানেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়—

যে সময় বাংলার মানুষ স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিচ্ছিল, সেই সময় তিনি কেন স্বাধীনতার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্বাধীনতার পর

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পরাজয় ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শাহ আজিজুর রহমান গ্রেপ্তার হন এবং সহযোগী আইনে আটক ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সাধারণ ক্ষমার আওতায় তিনি মুক্তি পান।

এরপর বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বদলাতে থাকে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শাহ আজিজুর রহমান আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ১৯৭৬ সালে পুনরুজ্জীবিত মুসলিম লীগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেন এবং পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক পরিসরে প্রবেশ করেন।

বিএনপিতে উত্থান

১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) যাত্রা শুরু হলে শাহ আজিজুর রহমান দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। তিনি দলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় শ্রম ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি।

এরপর আসে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সর্বোচ্চ পদ।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী

১৫ এপ্রিল ১৯৭৯ সালে শাহ আজিজুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতিত্বকালে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা ছিলেন।

এভাবেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী একজন রাজনীতিক স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় কয়েক বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন।

ইতিহাসের এই পর্বটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়।

জিয়াউর রহমানের ১৯৮১ সালের হত্যাকাণ্ডের পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শাহ আজিজুর রহমানও প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকেন।

কিন্তু সেই সরকার বেশিদিন টেকেনি।

এরশাদের অভ্যুত্থান

২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের সরকারকে উৎখাত করেন। এর সঙ্গে শাহ আজিজুর রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বেরও অবসান ঘটে।

এরপর তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আবারও পরিবর্তন আসে। ১৯৮৫ সালে বিএনপিতে বিভক্তি হলে তিনি একটি অংশের নেতৃত্ব দেন এবং কিছু সময়ের জন্য এরশাদের রাজনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত হন। পরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং মৃত্যুর কিছুদিন আগে আবার খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন মূলধারার বিএনপির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।

একজন সুবক্তা ও বহুভাষাবিদ

রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক, শাহ আজিজুর রহমানের বক্তৃতা ও সংসদীয় দক্ষতার কথা তাঁর সমসাময়িকরা উল্লেখ করেছেন। তিনি ছিলেন একজন প্রভাবশালী বক্তা ও দক্ষ পার্লামেন্টেরিয়ান।

বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তিনি উর্দু, ফারসি ও আরবি ভাষায়ও পারদর্শী ছিলেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই—

একজন মেধাবী, সুবক্তা ও দক্ষ রাজনীতিক;
কিন্তু একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এক বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

শেষ অধ্যায়

শাহ আজিজুর রহমান ঢাকায় ১ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

আজ তিনি নেই। কিন্তু ইতিহাসে তিনি রয়ে গেছেন।

রয়ে গেছেন এক জটিল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে—
একদিকে পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মী,
অন্যদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী;
একদিকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী,
অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা।

এই বৈপরীত্যই ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা।

ইতিহাসকে ভালোবাসতে হলে শুধু নিজের পছন্দের অধ্যায় পড়লেই হয় না। জানতে হয় কে কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন, কেন দাঁড়িয়েছিলেন, কোন সিদ্ধান্তের কী পরিণতি হয়েছিল।

নতুন প্রজন্মের কাছে তাই শাহ আজিজুর রহমানের গল্প শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জীবনী নয়—
এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের উত্থান-পতন, আদর্শের পরিবর্তন, ক্ষমতার পালাবদল এবং ১৯৭১-এর অবস্থানগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

কারণ ইতিহাস ভুলে গেলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যায়।

নতুন প্রজন্ম জানুক—
কীভাবে একজন মানুষ ইতিহাসের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন,
আর ইতিহাসের অন্য প্রান্তে এসে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

ইতিহাস জানুন।
প্রশ্ন করুন।
তারপর নিজের বিবেক দিয়ে বিচার করুন।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

https://bn.khaborwala.com/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।