নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চান্দাই উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে মদের বোতল হাতে কয়েকজন শিক্ষার্থীর নাচানাচির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশে এমন কর্মকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে। তবে ভিডিওতে দেখা বোতলের ভেতরে মদ ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেলে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নবম ও দশম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থীকে গান বাজিয়ে নাচানাচি করতে দেখা যায়। ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের হাতে বোতল নিয়ে নাচতে দেখা গেলেও সেটির ভেতরে কী তরল পদার্থ ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিও ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মাঠে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী একত্র হয়ে গান, নাচ ও আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠেছে। এ সময় নীরব, ইউনুস ও মিতু নামের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে গানের তালে নাচতে এবং বোতল হাতে অভিনয় করতে দেখা যায়। তাঁদের হাতে থাকা বোতলে মদসদৃশ তরল পদার্থ রয়েছে বলে ভিডিও দেখে কারও কারও ধারণা হয়েছে। তবে শুধু ভিডিও দেখে ওই তরল পদার্থের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ভিডিওতে কয়েকজন শিক্ষার্থীর গায়ে সাদা গেঞ্জিও দেখা যায়। এসব গেঞ্জিতে বিভিন্ন ধরনের বাক্য লেখা ছিল। শিক্ষাবর্ষের পাঠদান শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের এমন আয়োজনের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে ভিডিওতে যাঁদের দেখা গেছে, তাঁদের কেউ ওই তরল পান করেছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি সামনে আসার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আচরণ, বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং শিক্ষকদের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উৎসবের ক্ষেত্রেও বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও সামাজিক পরিবেশের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। আবার ভিডিওতে দেখা বোতলের ভেতরে কী ছিল, তা যাচাই না করে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মদ পান বা মাদক ব্যবহারের অভিযোগ তোলা ঠিক হবে না বলেও মত রয়েছে।
যা বলছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক
চান্দাই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওবায়েদুল হক বিদ্যালয়ের মাঠে বোতল হাতে শিক্ষার্থীদের নাচানাচির ঘটনা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার নিয়মিত পাঠদানের শেষ দিনে বিকেল ৪টায় শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়া হয়েছিল। পরে শিক্ষার্থীরা আনন্দ করতে গিয়ে এমন কর্মকাণ্ডে জড়ায় বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
প্রধান শিক্ষকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৬০ জন। তাঁদের মধ্যে ২১ জন ছাত্র এবং ৩৯ জন ছাত্রী। শিক্ষার্থীরা আনন্দ করতে গিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ওবায়েদুল হক বলেন, ঘটনাটি তিনি পরে জানতে পেরেছেন। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ভিডিওতে দেখা বোতলের ভেতরে কী ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য তিনি জানাননি।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য
বিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বোতলের ভেতরে মদ ছিল, নাকি অন্য কোনো তরল পদার্থ, তা তাঁরা জানেন না। তাঁরা কাউকে ওই বোতল থেকে পান করতেও দেখেননি। তবে বিদ্যালয়ের মাঠে প্রকাশ্যে এভাবে বোতল হাতে নিয়ে নাচানাচি করাকে তাঁরা ভুল বলে স্বীকার করেছেন।
তাঁদের বক্তব্য থেকে বোতলের ভেতরের পদার্থ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। এ কারণে বিষয়টি যাচাই করে দেখা এবং ভিডিওতে প্রদর্শিত আচরণের প্রকৃত প্রেক্ষাপট জানা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসনের বক্তব্য
বড়াইগ্রাম উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেলিম আক্তার বলেন, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌসও ঘটনাটিকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, বিষয়টি জানার পর মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনার পর কী সিদ্ধান্ত আসবে এবং বোতলের ভেতরে থাকা তরল পদার্থের পরিচয় যাচাই করা হবে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
শৃঙ্খলা ও সচেতনতার প্রয়োজন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা দেওয়ার জায়গা নয়; শিক্ষার্থীদের আচরণ, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রও। শিক্ষাবর্ষের শেষ দিনে শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উৎসব অস্বাভাবিক নয়। তবে এমন আয়োজন যেন বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সে বিষয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তার ভিত্তিতে যাচাইহীন অভিযোগ প্রচার করা থেকেও বিরত থাকা জরুরি। চান্দাই উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘটনাতেও বোতলের ভেতরে মদ ছিল কি না, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মাদক ব্যবহারের অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এখন প্রশাসনের নির্দেশনার পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনার যথাযথ যাচাই, শিক্ষার্থীদের বক্তব্য শোনা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর পথও তৈরি হতে পারে।


