ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের নান্দাইল উপজেলায় চালবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেতুর রেলিং ভেঙে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এতে ট্রাকচালক মো. হুমায়ুন (২৫) নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই মামুনও গুরুতর আহত হয়েছেন। রবিবার (২৩ আগস্ট) ভোররাতে উপজেলার আমলিতলা জোরপুকুরপাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত হুমায়ুন ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার সরচাপুর গ্রামের মো. সুরুজ আলী শেখের ছেলে। আহত তাঁর ছোট ভাই মামুনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং কিছু সময়ের জন্য ওই সড়কে যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা সদর থেকে একটি মিনি ট্রাকে ৪০০ বস্তা চাল বোঝাই করা হয়। চালের চালানটি নোয়াখালীর উদ্দেশে নিয়ে যাত্রা করে ট্রাকটি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রবিবার ভোর আনুমানিক চারটার দিকে ট্রাকটি নান্দাইলের আমলিতলা জোরপুকুরপাড় এলাকায় পৌঁছায়।
এ সময় কোনো একপর্যায়ে চালক ট্রাকটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। এরপর ট্রাকটি সড়কের পাশের একটি সেতুর রেলিংয়ে সজোরে ধাক্কা দিলে রেলিং ভেঙে যায়। ট্রাকটি সেতুর অংশে আটকে পড়ে। সংঘর্ষের তীব্রতায় ট্রাকের সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায় এবং চালক হুমায়ুন গাড়ির ভেতরে আটকা পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শী তাবারক আলী জানান, ভোরের দিকে বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সময় তিনি বিকট শব্দ শুনতে পান। শব্দের উৎসের দিকে এগিয়ে গিয়ে তিনি সেতুর রেলিংয়ে আটকে থাকা চালবোঝাই ট্রাকটি দেখতে পান। পরে ট্রাকের কাছে গিয়ে চালককে রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় ভেতরে আটকে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেন।
পরে স্থানীয়দের সহায়তায় হুমায়ুনকে ট্রাক থেকে উদ্ধার করে নান্দাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ তাঁর মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে থাকতে পারে।
নান্দাইল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জীবন কুমার রায় দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং আহতদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করে। গুরুতর আহত হুমায়ুনকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
পুলিশের প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে হুমায়ুনের মরদেহ তাঁর ছোট ভাই মামুনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশ ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনা করছে।
এদিকে, হুমায়ুনের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে দুই ভাই মিলে যৌথভাবে মিনি ট্রাকটি কিনেছিলেন। ট্রাকটি ভাড়ায় চালিয়ে যে আয় হতো, তা দিয়েই তাঁদের পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করা হতো। ফলে দুর্ঘটনায় একদিকে যেমন পরিবারের একজন কর্মক্ষম সদস্যকে হারিয়েছে স্বজনেরা, অন্যদিকে তাঁদের আয়ের প্রধান মাধ্যমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একটি সড়ক দুর্ঘটনা তাই শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয়নি, একই সঙ্গে একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেও বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। দীর্ঘপথে পণ্যবাহী যান চলাচলের ক্ষেত্রে চালকের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, গাড়ির যান্ত্রিক সক্ষমতা, সড়কের অবস্থা এবং নিরাপদ গতিসীমা মেনে চলার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভোররাতে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে চালকের ক্লান্তি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এই দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণে ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
নিহত হুমায়ুনের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।


