নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে নামছেন বরগুনার জেলেরা, চোখে নতুন স্বপ্ন

বরগুনা:মা ইলিশ রক্ষায় টানা ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাত থেকেই বঙ্গোপসাগরে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ শিকারে নামছেন বরগুনার হাজার হাজার জেলে। দীর্ঘ বিরতির পর আবার সাগরে ফেরার ক্ষণে রূপালি ইলিশে জাল ভরবে—এমন প্রত্যাশায় উপকূলজুড়ে এখন যেন প্রস্তুতি ও ব্যস্ততার ধুম পড়েছে। তবে জলসীমায় ট্রলার ভাসানোর এই উদ্দীপনার আড়ালে রয়ে গেছে দেনার চিন্তা, জ্বালানি তেলের চড়া দাম এবং শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত মাছ মিলবে কি না—তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা।

নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে বরগুনার পাথরঘাটা, তালতলী, আমতলী ও বরগুনা সদর উপজেলার মৎস্য ঘাটগুলোতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলে ও ট্রলার মালিকেরা। ঘাটগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের তড়িঘড়ি। ট্রলারের ইঞ্জিন পরীক্ষা করা, ক্ষতিগ্রস্ত জাল মেরামত করা, বরফকল থেকে প্রয়োজনীয় বরফ সংগ্রহ করা এবং সাগরে কয়েক দিনের থাকা-খাওয়ার জন্য রশদ ও ডিজেল ট্রলারে তোলার কাজে নাওয়া-খাওয়া ভুলেছেন ঘাটকর্মীরা।

দীর্ঘদিন উপার্জন বন্ধ থাকায় উপকূলীয় এই এলাকাগুলোর সাধারণ জেলে পরিবারগুলোকে ধারদেনা করে দিন কাটাতে হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি সহায়তার কার্ড ও চাল বিতরণ প্রক্রিয়ায় এখনও নানামুখী বৈষম্য রয়ে গেছে। জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনায় মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৫২ হাজার ৪৭৬ জন। অথচ স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে এলাকাটিতে অনিবন্ধিত প্রকৃত জেলের সংখ্যা আরও প্রায় অর্ধলাখ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির কারণে বহু প্রকৃত জেলে সরকারি তালিকা থেকে বাদ পড়েন। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময় চাল সহায়তার যে সুযোগ ছিল, তা অনেক পরিবারের কাছে পৌঁছায়নি, আর যা মিলেছিল তাও প্রয়োজনের তুলনায় ছিল বেশ অপ্রতুল।

জেলা মৎস্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২২ দিনের এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে বেশ কঠোর অবস্থান বজায় রাখা হয়েছিল। এ সময়ে জলসীমায় মোট ৩২৫টি অভিযান এবং ৮৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। আইন অমান্য করে মাছ শিকারের দায়ে ৩০ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ১০টি মামলা দায়েরের পাশাপাশি ৮১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ ছাড়া জব্দ করা হয় প্রায় ৬ লাখ মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল। অন্যদিকে খাদ্য সহায়তা হিসেবে জেলার ৩৯ হাজার ৪৬৯ জন নিবন্ধিত জেলের মধ্যে মোট ৯৮৬ দশমিক ৭২৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

প্রস্তুতির সার্বিক বিষয়ে বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, নানা দেনা-পাওনার টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও জেলেরা বুক ভরা আশা নিয়ে সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছেন। তবে বাজারে জ্বালানি তেলসহ সব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সাগরে গিয়ে যদি পর্যাপ্ত মাছের দেখা না মেলে, তবে ট্রলারের জ্বালানি খরচ তোলা এবং আগের ঋণ পরিশোধ করা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। তিনি প্রকৃত সকল জেলেকে সরকারি খাদ্য সহায়তার আওতায় আনার আহ্বান জানান।

এদিকে বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেন, সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যেই প্রতি বছর এই ধরনের বৈজ্ঞানিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এই বিধিনিষেধ সঠিকভাবে পালিত হলে তার সুফল সরাসরি পান উপকূলীয় জেলেরা। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর এবার সাগরে প্রচুর ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রচুর মাছ আহরণ সম্ভব হলে জেলেরা নিজেদের দেনা শোধ করে দীর্ঘদিনের আর্থিক মন্দা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারবেন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।