নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় এক স্কুলছাত্রীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দিনের পর দিন দলবদ্ধ ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠে এসেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। ধর্ষণের শিকার দশম শ্রেণির ওই ছাত্রী বর্তমানে ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে। এই ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ এক আসামিকে গ্রেপ্তার করলেও মূল অভিযুক্ত বিএনপি নেতা এখনো অধরা।
ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত বকুল মিয়া (৫০) কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সহ-যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার রাতে ভুক্তভোগীর বাবা বাদী হয়ে বকুল মিয়াসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে কেন্দুয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে মামলার দুই নম্বর আসামি আবু মিয়াকে (৩৬) গ্রেপ্তার করে। তবে মূল অভিযুক্ত বকুল মিয়া ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন।
মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, নির্যাতনের শিকার মেয়েটিকে দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। ভুক্তভোগী মেয়েটি বর্তমানে স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। ঘটনাটি প্রথম শুরু হয় প্রায় চার বছর আগে, যখন সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর বকুল মিয়া তাকে ফাঁদে ফেলে একটি নির্জন বাড়িতে নিয়ে যান এবং জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। সেই সময় গোপনে ধর্ষণের দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করে রাখা হয়। পরবর্তীতে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া ও পরিবারকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে বকুল বারবার তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন।
ভিডিওর ভয় দেখিয়ে মাসের পর মাস ধরে তাকে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে বকুল মিয়ার এক নারী সহযোগী কৌশল করে ওই ছাত্রীকে একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। সেখানে বকুলের উপস্থিতিতে ও নেতৃত্বে একাধিক ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মেয়েটিকে বিভিন্ন বাসায় নিয়ে একইভাবে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
নৃশংস এই নির্যাতনের বিষয়টি এতদিন ভয়ে কাউকে জানাতে পারেনি কিশোরীটি। তবে গত ১ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার একটি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি পরিবারের লোকজনের নজরে আসে। সন্দেহ হলে স্বজনেরা তাকে নিয়ে গত ১৮ আগস্ট একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসকের কাছে যান। সেখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর পর চিকিৎসকেরা জানান, মেয়েটি বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী ছাত্রীটি জানায়, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বকুল ও তার সহযোগী আবু তাকে নানা জায়গায় নিয়ে যেত। সেখানে অন্যদের দিয়েও তাকে নির্যাতন করানো হতো। নরপশুদের এই অন্যায়ের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তি দাবি করেছে বিচারপ্রার্থী মেয়েটি।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দলীয় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি জানান, বিষগোড় সমাজবিরোধী এই অপকর্মের খবর তারা পেয়েছেন। দল কোনো অপরাধীর দায় নেবে না। অভিযুক্ত বকুল মিয়ার বিরুদ্ধে দ্রুতই কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম জানান, মামলার পরপরই অভিযান চালিয়ে এজাহারনামীয় আসামি আবু মিয়াকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। ভুক্তভোগী ছাত্রীর ডাক্তারি পরীক্ষা ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান। মামলার মূল আসামিসহ বাকি জড়িতদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।


