নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ পাহাড় ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে। নদীগুলোর উত্তাল স্রোত ও ভূমিধসের পর থেকে বহু স্থানীয় অধিবাসীর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের কয়েকশ পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। বুধবার দুর্গত এলাকাগুলো থেকে আসা ভিডিও চিত্রে ধ্বংসযজ্ঞের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।
উজান থেকে নেমে আসা কাদা ও পানির প্রবল স্রোতে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি, প্রধান সড়ক ও একাধিক জলবিদ্যুৎকেন্দ্র লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। একই সময়ে তিব্বতের গাইরং কাউন্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রেও বড় ধরনের ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। সেখানেও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছে বলে সীমান্ত কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিএফজেড জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ের ঠিক সাত মিনিট আগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে জানান, মৃদু এই ভূমিকম্পের পর হিমবাহ বা বরফধস থেকেই হয়তো নদীর স্বাভাবিক গতিপথে বাধা সৃষ্টি হয়ে এমন আকস্মিক বন্যার জন্ম হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা সংস্থা আইসিআইএমওডির প্রতিনিধি চিয়াংগং ঝাং ধারণা করছেন, লেন্দে নদীতে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নেমে পানি জমে যায় এবং তা হঠাৎ ফেটে গিয়ে ভাটিতে তাণ্ডব চালায়।
নেপাল পর্যটন কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দুর্ঘটনাকবলিত এলাকা থেকে অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটক ও ভ্রমণকারী নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন ১০৫ জন ভারতীয়, ৯৩ জন নেপালি, ৩ জন মার্কিন এবং ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, তাদের অন্তত ৮ জন নাগরিকের কোনো খোঁজ মিলছে না।
বুধবার সকাল ৯টার দিকে সীমান্ত এলাকার ভোটেকোশি নদীতে হঠাৎ করেই পানির উচ্চতা ও গতি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। মুহূর্তের মধ্যেই নদীর পাশের বসতি, প্রধান সড়ক এবং বেশ কিছু নির্মাণাধীন ও চালু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। নেপালের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কয়েকটি কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ বা ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানান, সেনাবাহিনী ও পুলিশকে পূর্ণ শক্তিতে উদ্ধারকাজে নামানো হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি জেলা রাসুয়ার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারও সহজে অবতরণ করতে পারছে না। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকে জানান, নদীর পাড়ের বেশ কয়েকটি বসতি মানচিত্র থেকে একপ্রকার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং তাঁর নিজের পরিবারের পাঁচজন সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন। রাসুয়ার জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পরিয়ার নিচু এলাকার সব অধিবাসীকে অবিলম্বে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
সীমান্তের অন্য পাশে চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতের শিগাতসে অঞ্চলের গাইরং বন্দরে ভয়াবহ ভূমিধসে যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও সড়ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাস্তায় প্রায় পাঁচ ফুট গভীর কাদা ও পলি জমে থাকায় চীন থেকে পাঠানো ৫৭৪ জন উদ্ধারকারীর দল দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান চালানো এবং দ্বিতীয় দফায় যেন কোনো বিপর্যয় না ঘটে সেদিকে কড়া নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
নেপাল সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল জানিয়েছেন, দুর্গম সীমান্ত এলাকায় দ্রুত উদ্ধারকাজ চালাতে ভারত ও চীনের কাছে সরাসরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালকে সব ধরনের মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। নেপালের নদীগুলোর পানি সরাসরি ভারতের দিকে প্রবাহিত হওয়ায় উত্তর প্রদেশ ও বিহার রাজ্যেও জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
উল্লেখ্য, তিব্বত থেকে উৎপন্ন ভোতে কোশি নদী নেপালের ত্রিশূলী নদীর সাথে মিশে পরবর্তীতে ভারতে ‘গন্ধক’ নদী নামে প্রবাহিত হয়েছে। হিমালয়ের ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতির কারণে এটি নতুন নয়; গত বছরও তিব্বতের একটি হিমবাহসংলগ্ন হ্রদ ফেটে এই একি নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, যাতে ৯ জন প্রাণ হারান এবং ২৪ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন।



