অর্থের বিনিময়ে পদ বাণিজ্য, অবৈধ লেনদেন এবং নৈতিক স্খলনের গুরুতর অভিযোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার। সংগঠন থেকে তাকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক ও বর্তমান সভাপতির স্বাক্ষরিত তিনটি প্রশাসনিক চিঠির মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সংগঠনের একাধিক গোপন সূত্রে প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই সালাহউদ্দিন আম্মারের সাথী পদ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির। তবে সম্প্রতি চলতি বছরের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিশেষ নির্দেশনায় বিষয়টি পুনরায় প্রকাশ্যে আসে।
প্রাপ্ত চিঠিপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় সালাহউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত নানাবিধ অভিযোগ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা হয়। সভায় মূল অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল—জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে রাজশাহী নগর ভবন থেকে ল্যাপটপ চুরির ঘটনায় জড়িত থাকা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ বাণিজ্য করা, অন্যান্য আর্থিক অনিয়ম এবং ব্যক্তিগত জীবনে নীতি-নৈতিকতা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড। এসব অভিযোগ জাতীয় গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হলে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।
ঐ বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি ও রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে আম্মারের ‘সাথী’ পদটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে শোকজ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হলেও উত্থাপিত মারাত্মক অভিযোগগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্য বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন তিনি।
ফলশ্রুতিতে ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সাংগঠনিক বৈঠকে সালাহউদ্দিন আম্মারকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর কয়েকদিন পর, ১৯ সেপ্টেম্বর মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয় যে, দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া এবং বারবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও নিজেকে সংশোধন না করায় আম্মারের সাথী পদ সম্পূর্ণ বাতিল করা হলো।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে চলতি ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের বর্তমান সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল একটি নতুন নির্দেশনা জারি করেন। ওই চিঠিতে পূর্বের বহিষ্কারাদেশ বহাল রাখার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সংগঠনের সকল নেতাকর্মীকে সালাহউদ্দিন আম্মারের কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডে মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে রাকসুর নির্বাচিত কর্মকর্তা ছাড়া সাধারণ নেতাকর্মীদের তাঁর সঙ্গে সব ধরনের ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখার অনুরোধ জানানো হয়।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান নিশ্চিত করেন যে, সালাহউদ্দিন আম্মার পূর্বে তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে ছাত্রশিবিরের সাথী হিসেবে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও তাঁর সাংগঠনিক রেকর্ড স্থানান্তরিত হয়। জুলাই আন্দোলনের সময়ও তিনি শিবিরের সহযোগিতা ও নিরাপত্তা পান। তবে পরবর্তীকালে অর্থ কেলেঙ্কারি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এবং যৌক্তিক জবাব দিতে না পারায় তাঁকে সেপ্টেম্বর মাসেই স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে। বর্তমানে শিবিরের সঙ্গে তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই।
অভিযোগ ও দলীয় শাস্তির বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর দিক থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।


