পাবনায় হাটের আধিপত্য নিয়ে শ্রমিক লীগ ও শ্রমিক দল নেতা খুন

পাবনা: উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ পশুর হাট পাবনার পুষ্পপাড়া হাটের ইজারা ও একক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে দুই রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করেছে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে হাটের ইজারাদারের কার্যালয়ে ঢুকে মুখে কাপড় বাঁধা ৫ থেকে ৭ জনের একদল দুর্বৃত্ত এই জোড়া হত্যাকাণ্ড চালায়। নৃশংস এই খুনের শিকার দুই ব্যক্তি সম্পর্কে আপন মামা ও ভাগিনা।
নিহতরা হলেন— কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত শ্রমিক লীগের পাবনা সদর উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক ও পুষ্পপাড়া হাটের দীর্ঘদিনের ইজারাদার আব্দুস সালাম (৫৭) এবং তার ভাগিনা ও আতাইকুলা ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি রিপন হোসেন (৩৫)। তারা উভয়েই সদর উপজেলার আতাইকুলা থানার পুষ্পপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। নিহত আব্দুস সালাম ওই গ্রামের আরজ আলীর ছেলে এবং রিপন স্থানীয় মেম্বর ওমেদ আলীর ছেলে। রিপন দীর্ঘদিন ধরে তার মামা সালামের সাথে ইজারাদারের সহযোগী হিসেবে হাটের কাজকর্ম দেখাশোনা করে আসছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতোই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুষ্পপাড়া হাটে অবস্থিত ইজারাদারের কার্যালয়ে বসে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করছিলেন আব্দুস সালাম ও তার ভাগিনা রিপন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ৫ থেকে ৭ জনের একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত মুখে কাপড় বেঁধে আচমকা কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অস্ত্রধারীরা ইজারাদার আব্দুস সালামকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে এলোপাতাড়ি কয়েক রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। মামাকে বাঁচাতে এবং আততায়ীদের বাধা দিতে এগিয়ে গেলে হামলার শিকার হন ভাগিনা রিপনও। তাকেও লক্ষ্য করে গুলি চালায় অস্ত্রধারীরা। গুলি লেগে দুজনই রক্তভেজা অবস্থায় কার্যালয়ের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পরপরই দুর্বৃত্তরা এলাকা ত্যাগ করে দ্রুত পালিয়ে যায়। গুলির শব্দ শুনে আশপাশের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে এসে তাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকা জুড়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের তথ্যানুযায়ী, পাবনা সদর উপজেলার আতাইকুলা থানাধীন পুষ্পপাড়া হাটটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় পশুর হাট হিসেবে পরিচিত। প্রতি সপ্তাহে এই হাটে কোটি কোটি টাকার গবাদিপশু বেচাকেনা হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই হাটের ইজারা দখল এবং হাসিল আদায়ের বিপুল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী ও অপরাধী চক্র সক্রিয় ছিল। টানা বিগত সাত বছর ধরে আব্দুস সালাম এই হাটের ইজারাদার হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন, যার ফলে স্থানীয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের বিরোধ তৈরি হয়। হাটের এই বিপুল অর্থ ও আধিপত্যকে ঘিরে এলাকাটিতে চরমপন্থী গোষ্ঠীর গোপন তৎপরতার অভিযোগও রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিহত সালামের বড় ভাই নিষিদ্ধ চরমপন্থী সংগঠন ‘পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’ (এমএল লাল পতাকা)-র এক সময়ের আঞ্চলিক নেতা ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন কারাভোগের পর সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হয়ে বাইরে এসেছেন। ফলে হাটের ইজারা সংক্রান্ত পুরনো শত্রুতা নাকি অন্য কোনো জটিলতা—কোন কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ জানান, প্রাথমিক তদন্তে পুষ্পপাড়া হাটের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নিহতদের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। জোড়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মূল অপরাধীদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল অভিযানে নেমেছে।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।