আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে সরকারের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্যকে গুজব ও অনানুষ্ঠানিক বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া এ সংক্রান্ত বক্তব্য দেওয়ার মাত্র চারদিনের মাথায় মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের এমন সরাসরি অস্বীকারের খবর জানিয়েছে দেশটির শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘নিউ স্ট্রেইটস টাইমস’।
বুধবার আয়োজিত মালয়েশিয়া সরকারের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে দেশটির সরকারের মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিল বলেন, বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর ওই বক্তব্যকে ঢাকা সরকারের ‘আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তিনি জানান, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আর রামানান তাঁকে নিশ্চিত করেছেন যে দুই লাখ কর্মী নিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মালয়েশিয়ার কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।
এর আগে গত রোববার সচিবালয়ে নতুন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ শুহাদা ওসমান সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের জানান, সেপ্টেম্বর থেকে ছয় মাসের মধ্যে তালিকাভুক্ত এজেন্সির মাধ্যমে দুই লাখ কর্মী নেবে মালয়েশিয়া। তিনি আরও দাবি করেন, এর বাইরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আরও ১০ হাজার শ্রমিক নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মালয়েশীয় হাইকমিশনার। কিন্তু মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্রের এমন স্পষ্ট বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আবার বিভ্রান্তি ও অস্পষ্টতা সৃষ্টি হয়েছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার এই নতুন প্রক্রিয়া শুরু থেকেই একের পর এক ‘সিন্ডিকেট’ বিতর্কে জর্জরিত। গত ২১ আগস্ট মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএস (FWCMS)-এ বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করে কুয়ালালামপুর। কেবল এই নির্দিষ্ট ২৫টি প্রতিষ্ঠানই কর্মী পাঠাতে পারবে—এমন সংবাদে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এই একচেটিয়া চর্চাকে বারবার ‘সিন্ডিকেট’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানান দেশের অন্যান্য জনশক্তি ব্যবসায়ীরা।
ব্যাপক সমালোচনার মুখে বাংলাদেশ সরকারের সুপারিশ ও অনুরোধে গত ২৮ আগস্ট আরও ৩১২টি এজেন্সিকে ‘সহযোগী এজেন্ট’ (অ্যাসোসিয়েট এজেন্ট) হিসেবে তালিকাভুক্ত করার কথা জানায় মালয়েশিয়া। নতুন নিয়ম অনুসারে, মূল ২৫টি এজেন্সির প্রতিটির অধীনে ১০টি করে এবং সরকারি এজেন্সি বোয়েসেল (BOESL)-এর অধীনে ৬২টি সহযোগী এজেন্সি কাজ করবে। কিন্তু সাধারণ জনশক্তি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই ৩১২টি সাব-এজেন্ট যদি নিজ নামে সরাসরি কর্মী পাঠাতে না পেরে মূল ২৫টি এজেন্সির ওপরই নির্ভর করতে হয়, তবে তা মূলত পুরোনো সিন্ডিকেটেরই একটি নতুন রূপ। এর ফলে কর্মীপ্রতি অভিবাসন ব্যয় আরও বহুলাংশে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রবাসীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের ইতিহাস দীর্ঘ বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির দায়ে ভারাক্রান্ত। নিচে ২০০৯ সাল থেকে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের প্রধান ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হলো:
-
২০০৯: অনিয়মের অভিযোগে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ ঘোষণা করে মালয়েশিয়া।
-
২০১৬: দীর্ঘ বিরতির পর ‘জিটুজি প্লাস’ (G2G Plus) পদ্ধতিতে শ্রমবাজার চালু করা হয় এবং মাত্র ১০টি এজেন্সির একটি বিতর্কিত সিন্ডিকেটকে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়।
-
২০১৭–২০১৮: ১০ এজেন্সির মাধ্যমে এই দুই বছরে মোট ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৭৯ জন বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান।
-
২০১৮ (সেপ্টেম্বর): দুই দেশের সরকারি সমঝোতায় কর্মীপ্রতি খরচ ৩৭ হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বিপুল আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে মালয়েশিয়া এই পদ্ধতি স্থগিত করে।
-
২০২১ (ডিসেম্বর): দুই দেশের মধ্যে নতুন চুক্তি সই হয়, যেখানে আবারো মালয়েশিয়াকে এজেন্সি বাছাইয়ের একচেটিয়া এখতিয়ার দেওয়া হয়।
-
২০২২ (আগস্ট)–২০২৪ (মে): নির্বাচিত ২৫টি মূল এজেন্সি এবং পরে বোয়েসেলসহ আরও ৭৬টি এজেন্সির মাধ্যমে মোট ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৭৯০ জন কর্মী দেশটিতে যান। সরকারি ব্যয় ৭৮,৯৯০ টাকা নির্ধারণ করা সত্ত্বেও গড়ে কর্মীপ্রতি ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠে।
-
২০২৪ (৩১ মে): সীমাহীন দুর্নীতি, মানবপাচার ও অনিয়মের দায়ে আবারও বাংলাদেশের জন্য সব ধরণের কর্মী নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। ফলে ভিসা ও যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও প্রায় ১৭ হাজার বাংলাদেশি কর্মী পৌঁছাতে পারেননি।
-
২০২৬ (জুন): বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান।
-
২০২৬ (আগস্ট-সেপ্টেম্বর): ২৫টি মূল ও ৩১২টি সহযোগী এজেন্সির তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে নতুন করে বাজার খোলার প্রক্রিয়া শুরু হলেও দুই লাখ কর্মী নিয়োগের তথ্য নিয়ে চরম বিভ্রান্তি দেখা দেয়।
কয়েক মাসের টানা কূটনৈতিক আলোচনার পর যখন আবারও শ্রমবাজার চালু হওয়ার একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তখন সিন্ডিকেট বিতর্ক এবং দুই লাখ কর্মী নিয়োগ নিয়ে এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বাংলাদেশি চাকরিপ্রার্থীদের নতুন করে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিল।


