নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পোশাকশ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সকালে সদর উপজেলার কাঠেরপুল এলাকায় এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় অন্তত ছয়জনকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকালে ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকার মাইক্রোফাইবার, লিবার্টিসহ আশপাশের কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে কাজ বন্ধ করে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে তাঁরা সড়কে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
একপর্যায়ে আন্দোলনরত শ্রমিকেরা আশপাশের অন্যান্য পোশাক কারখানার শ্রমিকদেরও কর্মস্থল থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। এ সময় কয়েকটি কারখানার দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। পরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা হাজীগঞ্জ-পোস্ট অফিস সড়কের কাঠেরপুল এলাকায় বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধের চেষ্টা করেন।
বিক্ষোভকারীরা একপর্যায়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে শিল্প পুলিশ ও থানা-পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে কাঠেরপুল ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিছু সময়ের জন্য ওই এলাকার যান চলাচল ও স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়।
শিল্প পুলিশ-৪-এর পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, মাইক্রোফাইবার কারখানার শ্রমিকেরা কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে এসে আশপাশের অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদেরও বের করে আনার চেষ্টা করেন। পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। শ্রমিকদের কোনোভাবেই সড়ক অবরোধ করতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করেন, যাতে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।
আগের দুই দিনও সড়ক অবরোধ
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে ফতুল্লা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ নতুন নয়। এর আগের দুই দিনও একই দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট ও জালকুড়ি এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছিলেন পোশাকশ্রমিকেরা।
ওই সময়ও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। অবরোধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। এতে কর্মজীবী মানুষ, যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বুধবারের ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী ছয়জনকে আটকের তথ্য জানিয়েছেন। তবে আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
মজুরি দাবিকে ঘিরে বাড়ছে শ্রমিক অসন্তোষ
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতে কর্মরত শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলে তার প্রভাব শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় পড়তে পারে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে সড়ক যোগাযোগ ও আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি মূলত তাঁদের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে—এমন উদ্বেগ থেকেই শ্রমিকদের মধ্যে বাড়তি মজুরির দাবি জোরালো হচ্ছে।
অন্যদিকে, পোশাকশিল্পের মালিকদের উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং রপ্তানি আদেশের বিষয়টিও মজুরি নির্ধারণের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি এবং শিল্পের সক্ষমতা—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা জরুরি।
ফতুল্লায় টানা কয়েক দিনের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা শ্রমিক অসন্তোষের স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে সড়ক অবরোধ বন্ধ বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। শ্রমিক প্রতিনিধি, কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সংলাপের মাধ্যমে মজুরিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।
বুধবার দুপুরের পর পরিস্থিতি শান্ত হলেও শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি এবং এ নিয়ে চলমান অসন্তোষের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ফতুল্লার শিল্পাঞ্চলে নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।


