শনিবার বিকেল থেকেই সিডনিতে শুরু হয়েছিল তুমুল শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাত। আবহাওয়া এতটাই প্রতিকূল হয়ে উঠেছিল যে গাড়ি চালানোর সময় কয়েক হাত দূরের দৃশ্যও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও থেমে থাকেননি সংগীতপ্রেমীরা। ডার্লিং হারবারের টিকটক এন্টারটেইনমেন্ট সেন্টারে জড়ো হন হাজারো দর্শক। সবার অপেক্ষা ছিল ভারতীয় সংগীতশিল্পী সনু নিগমের ‘রেভোল্যুশন ট্যুর’-এর সিডনি পর্বের জন্য।
ভেন্যুতে পৌঁছানোর পর বাইরের আবহাওয়ার সঙ্গে ভেতরের দৃশ্যের ছিল বিস্ময়কর পার্থক্য। বাইরে যখন শিলাবৃষ্টি আর বজ্রপাত, ভেতরে তখন মানুষের উচ্ছ্বাস। প্রায় ৯ হাজার দর্শকে পূর্ণ হয়ে যায় বিশাল মিলনায়তন। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোতেও দর্শকের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত স্থানটিতে আর যেন জায়গা অবশিষ্ট ছিল না।
এত বড় সমাগমের মধ্যেও দর্শক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। দর্শকেরা সুশৃঙ্খলভাবে মিলনায়তনে প্রবেশ করেন এবং অনুষ্ঠান শেষে একইভাবে বেরিয়ে যান। ভেন্যুটির ধারণক্ষমতাও প্রায় ৯ হাজার। সনু নিগমের সিডনি পর্বের আয়োজন করে সিনেস্টার ইভেন্টস।
নির্ধারিত সময়েই মঞ্চে সনু
কনসার্ট শুরুর সময় নির্ধারিত ছিল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। ঘড়ির কাঁটা নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতেই মঞ্চে উপস্থিত হন সনু নিগম। দীর্ঘ উদ্বোধনী পর্ব, একের পর এক বক্তৃতা কিংবা অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতার বদলে শুরু থেকেই ছিল সংগীত। সেই পরিবেশনা চলে রাত পৌনে ১১টা পর্যন্ত।
এক দিন আগেই নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে কনসার্ট শেষ করে সিডনিতে এসেছিলেন সনু নিগম। ব্যস্ত সফরসূচির পরও তাঁর পরিবেশনায় ক্লান্তির ছাপ খুব একটা দেখা যায়নি। তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে গান, নাচ এবং দর্শকদের সঙ্গে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে তিনি অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে রাখেন।
সিডনির পর অস্ট্রেলিয়া সফরের পরবর্তী গন্তব্য হিসেবে রয়েছে মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, অ্যাডিলেড ও পার্থ। ফলে সিডনির এই আয়োজন ছিল তাঁর অস্ট্রেলিয়া সফরের গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব।
কনসার্টে শিশু দর্শকদের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। উচ্চ শব্দের কারণে কানে চাপ কমাতে শিশুদের জন্য বিশেষ শব্দনিরোধক যন্ত্রের ব্যবস্থা ছিল। ফলে পরিবারের সদস্যদের নিয়েও অনেকেই অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পেরেছেন।
মঞ্চের আলো ও শব্দের পরিকল্পনাও পুরো আয়োজনকে আলাদা মাত্রা দেয়। প্রাণবন্ত গানগুলোর সময় উজ্জ্বল আলোতে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। আবার আবেগঘন গানগুলোর সময় আলো কমিয়ে তৈরি করা হয়েছে অপেক্ষাকৃত নরম ও বিষণ্ন আবহ। এতে গান শুধু শোনার বিষয় থাকেনি, বরং দর্শকের জন্য তা হয়ে উঠেছে একটি পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য-শ্রাব্য অভিজ্ঞতা।
এক গানে নীরবতা, পরের গানে উচ্ছ্বাস
‘সন্দেসে আতে হ্যায়’ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পুরো মিলনায়তনের পরিবেশ। কিছুক্ষণ আগেও যাঁরা উচ্ছ্বাসে মেতে ছিলেন, গানটি শুরু হতেই তাঁদের অনেকেই নীরব হয়ে যান। প্রবাসজীবনের দূরত্ব, অপেক্ষা এবং দেশে-ফেলে-আসা স্বজনদের স্মৃতি গানটির সঙ্গে দর্শকদের আবেগকে যেন এক জায়গায় এনে দেয়।
এর পরেই আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহ। ‘ইয়ে দিল দিওয়ানা’ শুরু হতেই অনেক দর্শক আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। শুরু হয় নাচ এবং শিল্পীর সঙ্গে সম্মিলিত কণ্ঠে গান। এরপর একে একে পরিবেশিত হয় ‘সুরজ হুয়া মদ্ধম’, ‘তানহাই’ এবং ‘পঞ্ছি নদিয়া পবন কে’-এর মতো জনপ্রিয় গান।
‘অভি মুঝ মে কহিঁ’ পরিবেশনের সময় মিলনায়তনে নেমে আসে অন্যরকম নীরবতা। সনু নিগমের কণ্ঠের ওঠানামা এবং আবেগঘন পরিবেশনা দর্শকদের মনোযোগ পুরোপুরি কেড়ে নেয়।
শেষপর্বে আসে ‘কাল হো না হো’। গানটির পরিচিত পঙ্ক্তিতে সনু নিগমের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান হাজারো দর্শক। একসময় পুরো মিলনায়তন ভরে যায় মুঠোফোনের আলোয়। প্রায় ৯ হাজার মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠ আর সেই আলোকিত পরিবেশ কনসার্টের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
টিকিটের দামেও বড় আয়োজনের ছাপ
কনসার্টটির বাণিজ্যিক পরিসরও ছিল উল্লেখযোগ্য। টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০৯, ২০৯, ৩০৯ ও ৪৫০ অস্ট্রেলীয় ডলার। প্রায় ৯ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে টিকিট বিক্রি থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আসার সম্ভাবনা থাকলেও মোট আয় নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
কারণ কোন মূল্যস্তরের কতগুলো টিকিট বিক্রি হয়েছে, সেই বিস্তারিত হিসাব জানা না থাকলে মোট বিক্রির পরিমাণ নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যায় না। তবে উচ্চমূল্যের টিকিটের পাশাপাশি বিপুল দর্শকসমাগম থেকেই বোঝা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় সনু নিগমের মতো দক্ষিণ এশীয় শিল্পীর প্রতি দর্শকদের আগ্রহ যথেষ্ট শক্তিশালী।
বড় ভেন্যু, উন্নত শব্দব্যবস্থা, মঞ্চসজ্জা, আলো এবং দীর্ঘ সময়ের সরাসরি পরিবেশনা—সব মিলিয়ে এটি ছিল বড় পরিসরের একটি সংগীত আয়োজন।
ভাষা আলাদা, অনুভূতি এক
এই কনসার্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি ছিল দর্শকদের বৈচিত্র্য। সেখানে শুধু ভারতীয় দর্শকই ছিলেন না। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপসহ অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় শ্রোতারাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রবাসীদের কাছে পরিচিত গান অনেক সময় শুধু গান থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শৈশব, পরিবার, বন্ধুত্ব, নিজের শহর কিংবা ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি। সনু নিগমের জনপ্রিয় গানগুলো সেই স্মৃতিকেই যেন আবার সামনে নিয়ে আসে।
এক ভারতীয় দর্শক জানান, সনু নিগমের গান শুনলে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। তাঁর কাছে শিল্পীর কণ্ঠ পুরোনো স্মৃতিকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলে।
অন্যদিকে এক অস্ট্রেলীয় দর্শক জানান, তিনি গানের ভাষা বুঝতে না পারলেও সনু নিগমের কণ্ঠের শক্তি ও আবেগ তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তাঁর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সংগীতের আবেদন অনেক সময় ভাষার সীমা অতিক্রম করতে পারে।
এক বাংলাদেশি দর্শকের কথাতেও উঠে আসে একই বাস্তবতা। তাঁর মতে, বড় ভারতীয় শিল্পীরা অস্ট্রেলিয়ায় এলে বাংলাদেশিরাও বিপুল সংখ্যায় কনসার্টে অংশ নেন। সনু নিগমের অনুষ্ঠানেও পরিচিত অনেক মুখকে একসঙ্গে দেখা গেছে।
প্রবাসে এমন আয়োজনের সামাজিক গুরুত্বও কম নয়। নিজ নিজ দেশ ও সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা মানুষ একটি পরিচিত গানকে কেন্দ্র করে একই জায়গায় মিলিত হন। সেখানে জাতীয়তা, ভাষা কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব কিছু সময়ের জন্য গৌণ হয়ে যায়।
সিডনির এই কনসার্টেও ছিল সেই দৃশ্য। ভারতীয়, বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, নেপালি, ভুটানি, শ্রীলঙ্কান, মালদ্বীপীয় ও অস্ট্রেলীয় দর্শকেরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একই গানে কণ্ঠ মিলিয়েছেন।
বাইরে তখন সিডনির আকাশে ঝড়ের দাপট। আর ভেতরে সনু নিগমের কণ্ঠে তৈরি হয়েছিল অন্য এক আবহ। কয়েক ঘণ্টার জন্য বহু দেশ, বহু ভাষা ও বহু পরিচয়ের মানুষ একই সুরে মিলেছিলেন। সংগীতই হয়ে উঠেছিল সেই মিলনের ভাষা।


