বায়ুদূষণে বিশ্বসেরার শীর্ষে ঢাকা, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ধুলো, ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণায় ভারী হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকার বাতাস। বিশ্বের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে বায়ুদূষণের মাত্রায় মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) শীর্ষে উঠে এসেছে ঢাকা। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের সূচকে এদিন রাজধানীর এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) স্কোর ছিল ২১৭। এই মাত্রার বায়ু ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়।

আইকিউএয়ারের বৈশ্বিক তালিকায় ঢাকার পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর। শহরটির একিউআই স্কোর ১৯৪। ভারতের কলকাতা ১৭৫ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। একই স্কোর নিয়ে দিল্লি রয়েছে চতুর্থ স্থানে। পঞ্চম অবস্থানে থাকা সিঙ্গাপুরের একিউআই স্কোর ১৬১।

একিউআই স্কোর মূলত বাতাসে দূষণকারী উপাদানের উপস্থিতি এবং তার সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি নির্দেশক। আইকিউএয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৫০ পর্যন্ত স্কোরকে ভালো বায়ু হিসেবে ধরা হয়। ৫১ থেকে ১০০ পর্যন্ত বায়ুর মান মাঝারি বা সহনীয়। ১০১ থেকে ১৫০ হলে তা সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়।

এর পরের ধাপে ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত স্কোরকে অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। ২০১ থেকে ৩০০ স্কোর হলে বায়ুর মান ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১-এর বেশি হলে তা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। ফলে ঢাকার ২১৭ স্কোর সাধারণ নাগরিকদের জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের শ্বাসযন্ত্র বা হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য দূষিত বাতাসের প্রভাব বেশি গুরুতর হতে পারে। দূষিত বাতাসে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। নগরজীবনে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা প্রয়োজনীয় কাজে প্রতিদিন বাইরে বের হতে হওয়ায় অনেক মানুষের জন্য দূষিত বাতাস এড়িয়ে চলাও কঠিন।

বাংলাদেশে বায়ুর মান নির্ধারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দূষণকারী উপাদান বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বস্তুকণা বা পার্টিকুলেট ম্যাটার—পিএম১০ ও পিএম২.৫—এবং নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (এনও₂), কার্বন মনোক্সাইড (সিও), সালফার ডাই-অক্সাইড (এসও₂) ও ওজোন (ও₃)। এসব উপাদানের মাত্রা বেড়ে গেলে বায়ুর সামগ্রিক মানও খারাপের দিকে যায়।

ঢাকার বায়ুদূষণের পেছনে রয়েছে একাধিক উৎস। ২০১৯ সালের মার্চে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রাজধানীর বায়ুদূষণের তিনটি প্রধান উৎস হিসেবে ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া এবং নির্মাণকাজের ধুলাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

রাজধানীতে অব্যাহত নির্মাণকাজ, সড়কে যানবাহনের চাপ এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা ধুলা বাতাসে দূষণকারী কণার পরিমাণ বাড়াতে পারে। যানবাহনের ধোঁয়াও নগরীর বায়ুমানের ওপর চাপ তৈরি করে। ফলে বায়ুদূষণ ঢাকার জন্য কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি নগরবাসীর জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

বায়ুদূষণের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গুরুতর হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণের সঙ্গে স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), ফুসফুসের ক্যান্সার এবং তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষ মারা যায়।

ঢাকার সর্বশেষ একিউআই স্কোর তাই শুধু একটি দিনের বায়ুমানের চিত্র নয়; এটি রাজধানীর দীর্ঘদিনের দূষণ সমস্যারও একটি প্রতিফলন। দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজে ধুলা কমানো, যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং বায়ুমান পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করা—এসব উদ্যোগই ঢাকার বাতাসের মান উন্নত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।