দেশের ব্যাংকিং খাতে মানুষের আস্থা ও হারানো সুনাম ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকের মালিক, চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার বিকেলে বঙ্গভবনে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আহ্বান জানান। বিএবির চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। বৈঠক শেষে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম সাংবাদিকদের এ বিষয়ে অবহিত করেন।
বৈঠকে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের ২৬টি ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা অংশ নেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে দেশের মানুষ গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছে। এর মধ্যেই শক্তিশালী মহলের সহযোগিতায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর প্রভাবে দেশের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দুর্বল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাটিয়ে উঠতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে আমানতকারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং খাত নিয়ে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর মতে, এ উদ্যোগ ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও স্বার্থের সংঘাত কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বৈঠকে ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিলের অর্থ ব্যবহারের বিষয়েও গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি এসব অর্থ প্রযুক্তি ও প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন এবং মানুষের কল্যাণে ব্যয়ের আহ্বান জানান।
নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ উদ্ভাবনী খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
বৈঠকে বিএবির নেতারা দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিং খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তবে অতীতে প্রভাবশালী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাধ্যমে ব্যাংক থেকে অর্থ বের করে নেওয়ার কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে বলে তারা জানান। আমানতকারীদের স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত না হওয়াকে তারা নিজেদের জন্যও বিব্রতকর বলে উল্লেখ করেন।
ব্যাংকারদের সংগঠনটির নেতারা জানান, দেশের মোট আর্থিক লেনদেনের মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এ পরিস্থিতিতে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার এবং কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন চালুর ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
তারা ব্যাংকিং খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানো, গ্রাম পর্যায়ে ব্যাংকের শাখা সম্প্রসারণ এবং পরিশোধিত মূলধন ও লভ্যাংশ প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ম বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। পাশাপাশি ব্যাংকিং কার্যক্রমের জন্য অনুকূল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
বিএবির প্রতিনিধি দল বৈঠকে দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সমস্যা, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কেও রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করে।
বৈঠকের আলোচনায় ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণের চাপ মোকাবিলা, আর্থিক লেনদেনের ডিজিটালাইজেশন এবং উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ; কারণ আমানত সংগ্রহ থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণ সরবরাহ—অর্থনীতির বড় একটি অংশই ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।


