ভুলে যেয়ো না—ওরাও মানুষ-স্মরণ-ডা. ফজলে রাব্বি ও তাঁর একটি প্রেসক্রিপশন

ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। মানুষের সেবা করাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ধর্ম-বর্ণ-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে চিকিৎসা দেওয়া ছিল তাঁর চিকিৎসকসত্তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।

কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রহরে মানবতার এই নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসককেও রেহাই দেয়নি ঘাতকেরা।

১৯৭১ সালের ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর—পরপর দুই রাতে তাঁর স্ত্রী জাহানারা রাব্বি একই স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্বপ্নে তিনি সাদা সুতির চাদর গায়ে তিন সন্তানকে নিয়ে এমন একটি স্থান জিয়ারত করছেন, যেখানে চারটি কালো থামের মাঝখানে সাদা চাদরে ঘেরা কী যেন!

১৫ ডিসেম্বর সকালে স্বামীকে স্বপ্নের কথা বললেন জাহানারা রাব্বি। ফজলে রাব্বি শান্তভাবে বলেছিলেন—

‘তুমি বোধহয় আমার কবর দেখেছ।’

কথাটি শুনে শিউরে উঠেছিলেন জাহানারা। তিনি পরিচিত অধ্যাপকদের বাড়িতে টেলিফোন করার জন্য স্বামীকে অনুরোধ করলেন। ফজলে রাব্বি একের পর এক ফোন করলেন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষকেই সেদিন ফোনে পাওয়া গেল না।

চারদিকে তখন যুদ্ধের শেষ উত্তাল সময়। আকাশে যুদ্ধবিমান। রকেট আর শেলের শব্দে কেঁপে উঠছে নগরী। মৃত্যুর ছায়া যেন ঢাকার আকাশজুড়ে।

সকাল ১০টায় মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল হলো।

এই অস্থিরতার মধ্যেও ডা. ফজলে রাব্বি বললেন, একজন অবাঙালি রোগীকে দেখতে তাঁকে পুরান ঢাকায় যেতে হবে।

স্ত্রী তাঁকে যেতে নিষেধ করলেন।

তিনি হেসে বললেন—

‘ভুলে যেয়ো না, ওরাও মানুষ।’

মানুষের প্রতি একজন চিকিৎসকের দায়বদ্ধতার এর চেয়ে গভীর পরিচয় আর কী হতে পারে?

তিনি রোগী দেখে কারফিউ শুরু হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরে এলেন। দুপুরে খাবার খেলেন। ঘরে ছিল আগের দিনের বাসি তরকারি। অথচ খেতে খেতে তিনি বললেন—

‘আজকের দিনে এত ভালো খাবার খেলাম।’

হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন—এটাই তাঁর শেষ দুপুর।

জাহানারা রাব্বি চাইছিলেন, সেদিন বিকেলেই তাঁরা বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন। ফজলে রাব্বি বললেন—

‘আচ্ছা, দুপুরটা একটু গড়িয়ে নিই।’

তারপরই এল সেই ভয়াবহ মুহূর্ত।

কিছুক্ষণ পর বাবুর্চি ছুটে এসে বললেন—

‘সাহেব, বাড়ি ঘিরে ফেলেছে ওরা।’

বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটি কাদালেপা মাইক্রোবাস। চারপাশে রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা।

নিচু স্বরে স্ত্রীকে ডা. ফজলে রাব্বি বললেন—

‘আমাকে নিতে এসেছে।’

দারোয়ানকে গেট খুলে দিতে বললেন তিনি।

তারপর ঘাতকদের সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। সময় তখন বিকেল চারটা।

সেদিনের সেই চলে যাওয়া ছিল তাঁর পরিবারের কাছে এক অনন্ত অপেক্ষার শুরু।

ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বির জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ সালে। ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়।

আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর সেই অমর মানবিক উচ্চারণ—

‘ভুলে যেয়ো না, ওরাও মানুষ।’

এই একটি বাক্য যেন তাঁর সমগ্র জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছবি।

যিনি মানুষের জীবন বাঁচাতে সারাজীবন চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন লিখেছেন, ঘাতকেরা তাঁকেই মৃত্যুর প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়েছিল। অথচ তাঁর রেখে যাওয়া মানবতার প্রেসক্রিপশন আজও আমাদের জন্য অমলিন।

ডা. ফজলে রাব্বি শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না—তিনি ছিলেন মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন হয়তো কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসার যে প্রেসক্রিপশন তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন, তা কোনোদিন পুরোনো হওয়ার নয়।

মানুষের সেবা করাই ছিল তাঁর ব্রত।
মানুষকে বাঁচানোই ছিল তাঁর ধর্ম।
আর সেই মানুষটিকেই বাঁচতে দেয়নি হায়েনার দল।

বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি শহীদ চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বিকে।

ভুলে যেয়ো না—ওরাও মানুষ।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।