নামের মিল এবং ঠিকানাসংক্রান্ত ভুলের কারণে দুই যুগ আগের একটি অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবর্তে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় এক বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছে নিরপরাধ মো. আলমাসকে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্তের পর তাঁর নির্দোষ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এবার তাঁকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
রোববার (৮ নভেম্বর) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ কারা কর্তৃপক্ষকে মো. আলমাসের মুক্তি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। আদালতের এই আদেশের মধ্য দিয়ে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে চলা আইনি জটিলতার অবসানের পথ তৈরি হলো।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০২ সালে মিরপুর থানায় অস্ত্র আইনে করা একটি মামলায় মো. আলমাছ নামে এক ব্যক্তির ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। কিন্তু সেই মামলার সাজা কার্যকর করতে গিয়ে পুলিশ গ্রেপ্তার করে একই রকম নামের আরেক ব্যক্তি মো. আলমাসকে। দুজনের নামের পাশাপাশি বাবার নাম ও ঠিকানার কিছু অংশে মিল থাকায় পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল।
কারাগারে থাকা আলমাস দাবি করে আসছিলেন, তিনি ওই অস্ত্র মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। প্রকৃত দণ্ডিত ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। নিজের পরিচয় ও নির্দোষিতার বিষয়টি আদালতের সামনে তুলে ধরতে তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্ত, উঠে আসে প্রকৃত পরিচয়
রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেন। একই সঙ্গে কারাগারে থাকা আলমাস এবং ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাইয়ের জন্য বিস্তারিত অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন আদালত।
এ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে। তাঁর তত্ত্বাবধানে একজন জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে তদন্ত পরিচালনা করতে বলা হয়। আদালতের নির্দেশে আদেশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছিল।
নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অনুসন্ধান প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কারাগারে থাকা মো. আলমাস এবং মিরপুর থানার অস্ত্র আইনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছ সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি।
প্রতিবেদনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গ্রেপ্তার আলমাস ওই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। প্রকৃত দণ্ডিত আলমাছ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন। অর্থাৎ, প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে থাকা ব্যক্তিকে ভুল পরিচয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এই প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার ধারাবাহিকতায় রিট আবেদনটি রোববার আদেশের জন্য হাইকোর্টের কার্যতালিকায় ওঠে। শুনানি শেষে আদালত আলমাসকে তাৎক্ষণিক মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন।
রিট আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ ও আবদুল্লাহ আবু সাঈদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শিহাব উদ্দিন খান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দীন মো. হানিফ।
ভুল গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি কারণ
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে এসব তথ্য উঠে আসে।
প্রথম কারণ—ঠিকানার মিল: গ্রেপ্তার হওয়া আলমাস ২০০৭ সালের আগে পরিবারসহ ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা গ্রামে বসবাস করতেন। অন্যদিকে, অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের গ্রামের নাম পূর্ব ধোয়াইর। তবে দুটি গ্রামই একই ডাকঘরের অধীন হওয়ায় ডাকঘরের নাম ব্যবহার করে ঠিকানা দেওয়ার প্রচলন থেকে পরিচয়ের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
দ্বিতীয় কারণ—বাবার নামের সাদৃশ্য: দুই ব্যক্তির বাবার নামেও উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের বাবার নাম মো. খলিলুর রহমান, যিনি খলিল নামেও পরিচিত। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার আলমাসের বাবার নাম শেখ খলিল। নামের এই সাদৃশ্যও ভুল শনাক্তকরণে ভূমিকা রেখেছে।
তৃতীয় কারণ—মামলার নথিতে ঠিকানার ভুল: ২০০২ সালে দায়ের করা অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের প্রকৃত ঠিকানা ছিল পূর্ব ধোয়াইর। কিন্তু মামলার নথিতে ভুলক্রমে তাঁর ঠিকানা দক্ষিণ বাহ্রা লেখা হয়। পরবর্তী সময়ে মামলার রায় এবং সাজা কার্যকরের জন্য জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও সেই ভুল ঠিকানা বহাল থাকে। ফলে একই ডাকঘরের অধীন এলাকায় বসবাসের তথ্য এবং নামের মিলের কারণে পুলিশ ভুল ব্যক্তিকে শনাক্ত করে।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করায় প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবর্তে আলমাসকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
দুই যুগ আগের অস্ত্র মামলার পটভূমি
রিট আবেদন ও এর সঙ্গে সংযুক্ত নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল মো. আলমাছ (২৪) এবং মো. নাজমুল আলম মামুনের (২২) বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় অস্ত্র আইনে মামলা করে পুলিশ।
মামলাটির বিচার শেষে ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মো. আলমাছকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে, মামলার অপর আসামি নাজমুল আলম মামুনকে খালাস দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় আলমাছ পলাতক থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে সাজা কার্যকরের পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ২০ মার্চের একটি পরোয়ানার ভিত্তিতে পুলিশ আলমাসকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বাবার নাম শেখ খলিল হওয়া সত্ত্বেও পরিচয়সংক্রান্ত বিভ্রান্তি দূর না করেই তাঁকে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে আদালতে হাজির করা হয়।
গত বছরের ৫ নভেম্বর তাঁকে আদালতে হাজির করার পর কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই তাঁকে কারাভোগ করতে হচ্ছিল। অথচ তিনি যে মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, সেই মামলার আসামিই ছিলেন না।
সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি আলোচনায় আসে
ভুল পরিচয়ে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিয়ে গত ৪ অক্টোবর প্রথম আলোতে ‘নামের মিলে ১০ মাস ধরে কারাগারে, প্রকৃত আসামি কে তদন্তের নির্দেশ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে দুই ব্যক্তির নাম, পারিবারিক পরিচয় ও ঠিকানার মিলের কারণে সৃষ্ট জটিলতার বিষয়টি সামনে আসে।
পরে আলমাসের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধান পরিচালিত হয়। সেই অনুসন্ধানেই নিশ্চিত হয়, সাজাপ্রাপ্ত আলমাছ ও কারাগারে থাকা আলমাস আলাদা ব্যক্তি।
একজন নিরপরাধ মানুষকে ভুল পরিচয়ে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ সময় কারাগারে আটকে রাখার ঘটনা আইন প্রয়োগ ও অপরাধী শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার নির্ভুলতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের আগে আসামির নাম, বাবার নাম, স্থায়ী ঠিকানা এবং অন্যান্য পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করা কতটা জরুরি, এই ঘটনা তা আবারও সামনে এনেছে।
হাইকোর্টের তাৎক্ষণিক মুক্তির নির্দেশে আলমাসের দীর্ঘ কারাভোগের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল এড়াতে পুলিশি যাচাই এবং বিচারিক নথি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে।


