ধান ও চালের প্রধান উৎপাদনস্থল হিসেবে পরিচিত জেলা নওগাঁয় চলতি মৌসুমে আউশ ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ভালো ফলন দেখে চাষিরা আশাবাদী হলেও এখন তাঁদের চোখে শুধুই হতাশার ছাপ। বাজারে ধানের যে দর মিলছে, তাতে উৎপাদনের মূল খরচই উঠছে না। গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি দর এক ধাক্কায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে। অন্যদিকে সার, সেচ, জ্বালানি ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বিঘায় কৃষককে গুনতে হচ্ছে লোকসান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত মৌসুমে জেলায় ৫১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আউশের আবাদ হলেও এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৫৭৩ হেক্টরে। গড়ে প্রতি একরে আউশ উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ৬৪ হাজার টাকা, যা বিঘাপ্রতি প্রায় ২১ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে স্থানীয় হাটগুলোতে প্রতি বিঘা থেকে পাওয়া ২০ থেকে ২২ মণ ধান বিক্রি করে কৃষকের হাতে আসছে মাত্র ১৭ থেকে ১৯ হাজার টাকা। ফলে কাঠফাটা রোদে পরিশ্রম করেও বিঘাপ্রতি অন্তত দুই থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত পকেট থেকে গুনতে হচ্ছে তাঁদের।
বর্তমানে নওগাঁর বিভিন্ন হাটে আউশ ধানের বেচাকেনার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দরপতনের প্রকৃত রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
| ধানের জাত / খাতের বিবরণ | বর্তমান বাজারদর / হার | গত বছরের বাজারদর / হার |
| কাটারি জাতের ধান (প্রতি মণ) | ৯০০ – ৯৬০ টাকা | ১,৩০০ – ১,৪০০ টাকা |
| জিরাশাইল জাতের ধান (প্রতি মণ) | ৮৫০ – ৯০০ টাকা | ১,৩০০ – ১,৪০০ টাকা |
| ব্রি-২৮ জাতের ধান (প্রতি মণ) | ৮০০ – ৮২০ টাকা | ১,২০০ – ১,৩০০ টাকা |
| গড়ে প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ | প্রায় ১,০০০ – ১,০৫০ টাকা | ৮৫০ – ৯০০ টাকা |
| প্রতি একরে উৎপাদন খরচ (কৃষি বিভাগ) | ৬৪,০০০ টাকা | ৫৪,০০০ – ৫৬,০০০ টাকা |
| প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ | ২১,০০০ টাকা | ১৬,০০০ – ১৮,০০০ টাকা |
| প্রতি বিঘায় ধানের গড় ফলন | ২০ – ২২ মণ | ২০ – ২২ মণ |
| প্রতি বিঘায় ধানের বিক্রয়মূল্য | ১৭,০০০ – ১৯,০০০ টাকা | ২৬,০০০ – ৩০,০০০ টাকা |
| বিঘাপ্রতি নিট লোকসান / লাভ | ২,০০০ – ৪,০০০ টাকা লোকসান | ৮,০০০ – ১২,০০০ টাকা লাভ |
| আউশ চাষের জমির পরিমাণ (নওগাঁ) | ৫৮,৫৭৩ হেক্টর | ৫১,৩০০ হেক্টর |
হাট ঘুরে মহাদেবপুর উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেনের মতো বহু চাষির হতাশার কথা জানা যায়। দশ মণ জিরাশাইল ধান হাটে নিয়ে এসে তিনি মাত্র ৮৮০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। পরিবহন খরচের ভয়ে কম দামেই তিনি ধান তুলে দিয়েছেন ফড়িয়ার হাতে। অন্যদিকে এনজিওর ঋণ ও বর্গা জমির চুক্তি মেটাতে বাধ্য হয়েই ছাতড়া হাটে পানির দরে ধান বিক্রি করছেন প্রতিনিয়ত অসংখ্য প্রান্তিক কৃষক।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাটে ধানের দর তলানিতে নামলেও মোকাম কিংবা খুচরা চালের বাজারে তার ইতিবাচক কোনো প্রভাব পড়েনি। মোটা কিংবা সরু—সব ধরনের চাল আগের উচ্চ দামেই বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। চালকল মালিকেরা জানাচ্ছেন, বোরো মৌসুমের রেকর্ড উৎপাদন এবং বিগত সময়গুলোতে অতিরিক্ত চাল আমদানির ফলে অটো মিলগুলোতে চালের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বাজারে নতুন করে চালের চাহিদা না থাকায় মিলাররা আড়ত থেকে ধানের ক্রয় অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছেন।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার জানান, বিগত দিনে চাল আমদানির নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে দেশীয় চালের বাজারে মন্দা তৈরি হয়েছে। এই আমদানির রেশ আগামী আমন মৌসুমেও থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার ফলে আমন চাষিরাও ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হতে পারলে কৃষকের জন্য এটি লাভজনক হতো। সরকারি ক্রয় অভিযান জোরদার করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান না কিনলে এই বিপুল লোকসান ঠেকানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।



